কাচ উৎপাদনের মূলনীতি এবং কাচ রিসাইকেল প্রত্রিয়া ব্যাখ্যার বিস্তারিত
- সিলিকা বা বালি (SiO2): কাচের প্রধান কাঠামো গঠনকারী উপাদান (অম্লীয় অক্সাইড)।
- সোডা অ্যাশ বা সোডিয়াম কার্বনেট (Na2CO3): ফ্লাক্স (Flux) হিসেবে কাজ করে বালির উচ্চ গলনাঙ্ক (১৭০০°C থেকে কমিয়ে প্রায় ১২০০° – ১৫০০°C-এ) নামিয়ে আনে।
- চুনাপাথর বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3): কাচকে ক্ষয়রোধী ও পানিতে অদ্রবণীয় করে স্থায়িত্ব বাড়ায়।
- কিউলেট (Cullet): ভাঙা বা পুরনো কাচের টুকরা; এটি ব্যবহারে কাঁচামালের বিগলন দ্রুত হয় এবং জ্বালানি শক্তি সাশ্রয় হয়।
- রঞ্জক পদার্থ: বিভিন্ন আকর্ষণীয় বর্ণ সৃষ্টির জন্য— হলুদ বর্ণের জন্য ফেরিক লবণ, সবুজ বর্ণের জন্য ফেরাস বা ক্রোমিয়াম লবণ, এবং বেগুনি বর্ণের জন্য ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড (MnO2) যোগ করা হয়।
সিলিকাকে (SiO2) সোডা অ্যাশ (Na2CO3)-এর সাথে উত্তপ্ত করা হলে, সোডিয়াম সিলিকেট (Na2SiO3) উৎপন্ন হয়:
সোডিয়াম সিলিকেট (Na2SiO3) শীতল করা হলে এটি কঠিন কাচ সদৃশ বস্তুতে পরিণত হয়। এটি পানি কাচ বা ওয়াটার গ্লাস (পানিতে দ্রাব্য) নামে অভিহিত।
অপরদিকে, সিলিকাকে (SiO2) ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3)-এর সাথে উত্তপ্ত করা হলে, ক্যালসিয়াম সিলিকেট (CaSiO3) উৎপন্ন হয়:
কিন্তু সোডা অ্যাশ (Na2CO3) এবং ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3) মিশ্রণের সাথে সিলিকাকে (SiO2) উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হলে সোডিয়াম ক্যালসিয়াম সিলিকেট উৎপন্ন হয়। শীতলীকরণের পর এটি কাচ সদৃশ স্তরে পরিণত হয়, যা পানি ও এসিডে সম্পূর্ণ অদ্রাব্য (সাধারণ কাচ বা সোডা-লাইম গ্লাস):
সাধারণত বিভিন্ন কাঁচামাল অর্থাৎ সোডা অ্যাশ (Na2CO3), চুনাপাথর (CaCO3), ডলোমাইট [CaMg(CO3)2], ফেল্ডস্পার এবং বালি (SiO2)-এর আনুপাতিক মিশ্রণকে ওজন করে নিয়ে চুল্লিতে ১০–১২ ঘণ্টা 1400°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে তরল Glass metal তৈরি করা হয়। কাচকে হলুদ বর্ণের জন্য ফেরিক লবণ, সবুজ বর্ণের জন্য ফেরাস বা ক্রোমিয়াম লবণ এবং বেগুনি বর্ণের জন্য ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড যোগ করা হয়। গলিত কাচে কোনো বুদবুদ থাকলে তা দূর করতে (যেমন: SO2 বা CO2) স্বচ্ছকারক হিসেবে Al2O3, NaNO3, NH4Cl ইত্যাদি যোগ করা হয়।
এ তরল Glass metal-কে ছাঁচে ফেলে, ফু দিয়ে (Blowing), রোলিং বা চাপের মাধ্যমে যন্ত্রে অথবা হাতে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বস্তুর নির্দিষ্ট Shape বা আকৃতি দেওয়া হয়।
আকৃতি দেওয়া কাচের দ্রব্যকে আঘাত ও তাপমাত্রা সহনীয় করার জন্য অ্যানিলিং করা হয়। অ্যানিলিং না করা হলে কাচ সামান্য তাপমাত্রার পরিবর্তন এমনকি সাধারণ আঘাত সহ্য করতে পারে না এবং ফেটে যায়। প্রতিটি কাচের গলনাঙ্কের নিচে একটি সংকট তাপমাত্রা (Critical temperature) থাকে। কাচকে উত্তপ্ত করে তার সংকট তাপমাত্রার ওপরে কিছুক্ষণ রেখে ধীরে ধীরে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে শীতল করা হয়। ফলে কাচের অ্যানিলিং সম্পন্ন হয়। অ্যানিলিং করার পর কাচের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সুষম ও চাপমুক্ত হয়; ফলে কাচ তাপমাত্রা-সহ, ঘাতসহ এবং টেকসই হয়।
সবশেষে উৎপাদিত কাচ সামগ্রীকে পরিষ্কার পানি দ্বারা ধুয়ে পরিষ্কার করা হয় এবং এরপর গ্রেডিং, পলিশকরণ, প্রান্ত কর্তন (Cutting) ও গ্লেজিং সম্পন্ন করে বাজারজাতকরণের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।
উত্তর: রিসাইকেল (Recycle) বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ হলো এমন একটি পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত বর্জ্য সামগ্রীকে ফেলে না দিয়ে বিশেষ যান্ত্রিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পুনরায় নতুন এবং ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা হয়। এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিখ্যাত ‘3R’ নীতির (Reduce, Reuse, Recycle) অন্যতম প্রধান ধাপ।
গৃহস্থালি, হোটেল ও শিল্প-কারখানা থেকে ব্যবহৃত বা ভাঙা কাচের বোতল ও বয়াম নির্ধারিত রিসাইক্লিং বিনে সংগ্রহ করা হয় এবং তা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
কাচগুলোকে প্রধান তিনটি রঙে আলাদা করা হয়—স্বচ্ছ (Flint), সবুজ (Green) এবং বাদামি (Amber)। বিভিন্ন রঙের কাচে ধাতব অক্সাইডের সংযুক্তি ভিন্ন হওয়ায় রঙ না মিশিয়ে আলাদা গলানো অপরিহার্য।
চিত্র ১: ব্যবহৃত কাচ সংগ্রহ ও রঙ অনুযায়ী পৃথকীকরণ (Color Sorting)
বাছাই করা কাচকে ক্রাশারে দিয়ে গুঁড়ো করে নির্দিষ্ট আকারের ছোট ছোট দানায় পরিণত করা হয়। এই প্রক্রিয়াজাত কাচের টুকরাগুলোকে বলা হয় কিউলেট (Cullet)।
কিউলেটের সাথে লেগে থাকা ধুলাবালি ও আঠা ধুয়ে ফেলা হয়। চুম্বকের সাহায্যে ধাতব ঢাকনা এবং এয়ার ক্লাসিফায়ার বা অপটিক্যাল সেন্সরের মাধ্যমে সিরামিক, প্লাস্টিক ও কাগজ সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়।
পরিশোধিত কিউলেটকে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট অনুপাতে কাঁচামালের (বালি, সোডা অ্যাশ, চুনাপাথর) সাথে মিশিয়ে ফার্নেসে প্রায় ১৩০০° – ১৫০০°C তাপমাত্রায় গলানো হয়। সাধারণ কাঁচামালের তুলনায় কিউলেট দ্রুত গলে, ফলে প্রচুর জ্বালানি সাশ্রয় হয়।
গলিত কাচকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে ব্লোয়িং বা প্রেসিংয়ের মাধ্যমে নতুন বোতল বা বয়ামের আকার দেওয়া হয়। এরপর ‘লিয়ার’ (Lehr) ফার্নেসে ধীরে ধীরে ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় শীতল (Annealing) করা হয়, যাতে অভ্যন্তরীণ কোনো পীড়ন (Internal Stress) না থাকে এবং কাচ ভঙ্গুর না হয়।
প্রস্তুতকৃত কাচপণ্যের কোনো ফাটল, বুদবুদ বা পুরুত্বের ত্রুটি আছে কি না তা সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করে ব্যবহারের জন্য বাজারে সরবরাহ করা হয়।
