প্রি-ট্যানিং (Pre-Tanning) বা বীম হাউজ অপারেশন ও ভেজিটেবল ট্যানিং কী? ভেজিটেবল ট্যানিং এর মূলনীতি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: যে সকল প্রাণীর ত্বক প্রক্রিয়াজাতকরণের পর সেটি নমনীয়তা বা প্রসারণশীলতা, স্থিতিশীলতা এবং পানিনিরোধক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে তাদের চামড়া (Leather) বলে।
উত্তর: চামড়াকে রোগজীবাণুমুক্ত করে, চামড়ার গুণাবলি অক্ষুণ্ণ রেখে, চামড়াকে পাকা করে দীর্ঘদিন ব্যবহারোপযোগী করে তোলার পদ্ধতিকে ট্যানিং (Tanning) বলে।
উত্তর:
প্রি-ট্যানিং: কাঁচা চামড়াকে সরাসরি ট্যানিং না করে রাসায়নিক ও গাঠনিকভাবে ট্যানিং এজেন্টের প্রবেশোপযোগী করার প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক ধাপগুলোকে প্রি-ট্যানিং (Pre-Tanning) বা বীম হাউজ অপারেশন বলে। চামড়ার মূল উপাদান হলো প্রায় ৮৫% কোলাজেন তন্তু (প্রোটিন)। কাঁচা অবস্থা থেকে ক্রোম ট্যানিংয়ের উপযোগী করা পর্যন্ত প্রধান ধাপগুলো নিচে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো:
ভেজিটেবল ট্যানিং: কতিপয় উদ্ভিদের নির্যাস থেকে প্রাপ্ত ট্যানিং বিজারক (যেমন: ট্যানিক এসিড) দ্বারা কাঁচা চামড়াকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাকা চামড়ায় পরিণত করার প্রক্রিয়াকে ভেজিটেবল ট্যানিং (Vegetable Tanning) বলে।
পশু জবাইয়ের পর কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু করতে কয়েকদিন সময় লাগে, তাই চামড়াকে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ও পচন থেকে রক্ষা করতে কিউরিং করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় কাঁচা চামড়ায় প্রচুর পরিমাণে খাবার লবণ (NaCl) মেখে রাখা হয়, যার ফলে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় চামড়া থেকে অতিরিক্ত পানি অপসারিত হয়। পানির অভাবে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি বন্ধ থাকে এবং চামড়ার মূল উপাদান কোলাজেন প্রোটিন দীর্ঘ সময় অক্ষত ও সংরক্ষিত থাকে।
কিউরিং করা শুকনো ও শক্ত চামড়াকে পরিষ্কার পানির বড় ড্রামে ভিজিয়ে পুনরায় আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে সোকিং বলে। পানিতে ডুবিয়ে রাখার ফলে চামড়া পানি শোষণ করে স্বাভাবিক নমনীয় অবস্থায় ফিরে আসে। একই সাথে চামড়ার গায়ে লেগে থাকা কিউরিংয়ের অতিরিক্ত লবণ, রক্ত, কাদা-মাটি ও দ্রবণীয় অপ্রয়োজনীয় প্রোটিন সম্পূর্ণরূপে ধুয়ে অপসারিত হয়।
চামড়া থেকে অপ্রয়োজনীয় পশম, লোমকূপ এবং চর্বি দূর করার জন্য এটিকে ক্ষারীয় চুন [Ca(OH)2] এবং সোডিয়াম সালফাইড (Na2S)-এর মতো শার্পেনিং এজেন্টের মিশ্রণে ডুবিয়ে রাখা হয়। চুলের প্রধান উপাদান কেরাটিন প্রোটিনের সিস্টিন অ্যামাইনো অ্যাসিডের মধ্যকার ডাই-সালফাইড (-S-S-) বন্ধন এই দ্রবণের রাসায়নিক ক্রিয়ায় ভেঙে যায়। ফলে চামড়ার উপরিভাগ থেকে পশম, আলগা ময়লা ও অতিরিক্ত চর্বি সহজে উঠে আসে এবং ভেতরের কোলাজেন তন্তুগুলো প্রসারিত হয়।
আগের ধাপে ব্যবহৃত অতিরিক্ত চুন অপসারণ এবং চামড়াকে মসৃণ করার জন্য চামড়াকে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (NH4Cl) দ্রবণে ধুয়ে এর তীব্র ক্ষারীয় ভাব প্রশমিত বা ডিলাইমিং করা হয়। এরপর এতে প্যানক্রিয়াটিক এনজাইম যোগ করে বেটিং সম্পন্ন করা হয়, যা মূল কোলাজেন তন্তুকে অক্ষত রেখে অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় গবলেট প্রোটিন ও আঠালো পদার্থ দূর করে দেয়। এর ফলে চামড়া অত্যন্ত নরম, ছিদ্রযুক্ত ও মসৃণ রূপ লাভ করে।
কতিপয় উদ্ভিদের ছাল, পাতা, ফল এবং মূল ইত্যাদিকে ভালোমতো পিষে কয়েকদিন পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এর থেকে ট্যানিং পদার্থ নিঃসরিত হয়ে দ্রবণে চলে আসে। ট্যানিং পদার্থ মূলত ট্যানিন, ট্যানিক এসিড এবং পলিফেনল গ্লুকোসাইডের মিশ্রণ।
উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত ট্যানিং পদার্থের দ্রবণে পশুর কাঁচা চামড়া কয়েকদিন ভিজিয়ে রাখলে ট্যানিক এসিড পশুর কাঁচা চামড়ার কোলাজেন প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে পাকা লেদার তৈরি করে:
ট্যানিন পদার্থের প্রধান উৎস সাধারণত গাছ-পালা তথা উদ্ভিদ বলে এ প্রক্রিয়াকে উদ্ভিজ্জ ট্যানিং বা ভেজিটেবল ট্যানিং বলে।
উদ্ভিজ্জ ট্যানিং বা ভেজিটেবল ট্যানিং একদিকে সময়সাপেক্ষ এবং অন্যদিকে ট্যানিন (গাছের কষ) সংগ্রহের জন্য উদ্ভিদ জগত ধ্বংস হয় বলে এ পদ্ধতি এখন আর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় না।
