চামড়া শিল্পের দূষকের ক্ষতির প্রভাব, ট্যানিং-এ Milk of lime এর ভূমিকা, চামড়ার ট্যানিং এ লবণ যুক্ত করার কারণ।
চামড়া প্রসেসিং প্রক্রিয়ায় নির্গত ধুলাবালি, গোবর, রক্ত, মাংস এবং দ্রবণীয় প্রোটিন পচে গিয়ে প্রচুর দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে ও মারাত্মক বায়ু দূষণ ঘটায়। এছাড়া বর্জ্যে বিদ্যমান অতিরিক্ত খাবার লবণ (NaCl) ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মাটি ও পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দূষণ ঘটায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের ত্বক ও দেহে তীব্র প্রদাহ এবং শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয় এবং পরিবেশের জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চামড়ার লোম অপসারণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত চুন, শার্পেনিং এজেন্ট [Na2S এবং NaCN] এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ থেকে উৎপন্ন সালফাইড আয়ন, ধাতব কণা এবং ভাসমান কঠিন কণা পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। এর ফলে পানির BOD (Biochemical Oxygen Demand) অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায় এবং পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বা DO (Dissolved Oxygen)-এর পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পায়। অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে পুরো জলজ ইকোসিস্টেমসহ সামগ্রিক প্রাণীকুল ধ্বংসের মুখে পড়ে।
চুন অপসারণ বা ডিলাইমিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম লবণ [NH4Cl এবং (NH4)2SO4] থেকে নির্গত অ্যামোনিয়া গ্যাস (NH3), ক্লোরাইড আয়ন (Cl−) এবং সালফেট আয়ন (SO42−) সরাসরি উন্মুক্ত পানি ও বায়ুমণ্ডলে মিশে ব্যাপক পানি ও বায়ু দূষণ সৃষ্টি করে।
ক্রোম ট্যানিংয়ে ব্যবহৃত ট্রাই-ভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম (Cr3+) আয়ন পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সংস্পর্শে জারিত হয়ে অত্যন্ত বিষাক্ত ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম (Cr6+) আয়নে রূপান্তরিত হয়। এটি জলজ পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে (Food Chain) প্রবেশ করে মানবদেহে তীব্র বিষক্রিয়া ঘটায়। এর প্রভাবে মানুষের যকৃত (Liver) ও কিডনি বিকল হয়ে পড়ে, চর্মরোগ, পাকস্থলীর মারাত্মক ঘা/আলসার, ফুসফুসে ক্যান্সার, ব্রঙ্কাইটিস এবং গর্ভবতী মায়ের গর্ভস্থ শিশু ও ভ্রূণের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়।
ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য চামড়ার টুকরা থেকে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি পোলট্রি খাদ্য (Poultry Feed) যদি হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে খাদ্যের মাধ্যমে মাংস ও ডিমে বিপজ্জনক মাত্রায় ক্রোমিয়াম সংক্রমণ ঘটে, যা মানবদেহে জৈব সঞ্চয়ন (Bio-accumulation) ঘটায়।
উত্তর: Milk of lime বলতে মূলত ক্ষারীয় চুন বা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [Ca(OH)2]-এর গাঢ় জলীয় দ্রবণকে বোঝায়, যার সাথে শার্পেনিং এজেন্ট হিসেবে সোডিয়াম সালফাইড (Na2S), সায়ানাইড বা অ্যামাইন জাতীয় পদার্থ যুক্ত থাকে।
ট্যানিং প্রক্রিয়ায় সোকিং (Soaking) ধাপের ঠিক পরেই লাইমিং করা আবশ্যক। লাইমিং ধাপে Milk of lime মূলত নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:
- (i) পশম ও কেরাটিন অপসারণ: এটি চুলের কেরাটিন প্রোটিনের ডাই-সালফাইড বন্ধন ভেঙে চামড়ার পশম, লোমকূপ, নখ ও কেরাটিনাস জাতীয় অপ্রয়োজনীয় পদার্থ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত করে।
- (ii) মিউসিন বিমুক্তকরণ: চামড়ার তন্তুর মাঝে থাকা দ্রবীভূত অপ্রয়োজনীয় নন-কোলাজেন প্রোটিন, যেমন—মিউসিনকে দ্রবীভূত করে বিমুক্ত করে।
- (iii) আঁশ পৃথকীকরণ ও মসৃণতা: এটি চামড়ার মূল কোলাজেন তন্তু বা ফাইবারগুলোকে ফুলিয়ে পরস্পরের থেকে আলাদা করে এবং অভ্যন্তরীণ স্তরকে অত্যন্ত মসৃণ ও নমনীয় করে।
- (iv) গ্রিজ ও চর্বি অপসারণ: চামড়ায় আটকে থাকা গ্রিজ জাতীয় পদার্থ, তেল ও অতিরিক্ত চর্বিকে সাবানায়ন (Saponification) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্কাশিত ও নির্গত করে।
- (v) ট্যানিং উপযোগী কোলাজেন গঠন: তন্তুগুলোকে উপযুক্তভাবে প্রসারিত ও ফাঁপা করে পরবর্তী ধাপে ট্যানিং এজেন্টের প্রবেশ সহজ করে ট্যানিং ক্রিয়াকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ করে তোলে।
উত্তর: চামড়া ট্যানিংয়ের সাহায্যে পশুর কাঁচা চামড়াকে দীর্ঘস্থায়ী ও মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়। ট্যানিং প্রক্রিয়ায় (বিশেষ করে কিউরিং ও পিকলিং ধাপে) চামড়াকে লবণযুক্ত করার মূল কারণসমূহ হলো:
- ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ও পচন রোধ: কাঁচা চামড়ায় লবণ (NaCl) যোগ করার ফলে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় চামড়ার অতিরিক্ত পানি অপসারিত হয়। এর ফলে চামড়ায় বিদ্যমান কোলাজেন প্রোটিন ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ও পচন থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।
- অ্যাসিডের ক্ষতিকর স্ফীতি (Acid Swelling) রোধ: পিকলিং ধাপে চামড়ার pH মান ২.৫–৩.৫ এ নামানোর জন্য অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়। উচ্চ ঘনমাত্রার লবণের উপস্থিতি এই অ্যাসিডের তীব্রতায় কোলাজেন তন্তুর অস্বাভাবিক ফুলে ওঠা (Acid Swelling) এবং চামড়া ফেটে যাওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
- ট্যানিং এজেন্টের সুষম প্রবেশ: লবণ যোগ করার ফলে কোলাজেন তন্তুর অসম সংকোচন রোধ পায়, যা পরবর্তীতে খনিজ ক্রোমিয়াম ট্যানিং পদার্থকে চামড়ার অতি গভীর স্তর পর্যন্ত সহজে ও সমভাবে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
