সিরামিক কী? সিরামিক উৎপাদনের মূলনীতি ও সিরামিক প্রস্তুত প্রণালী ধাপ গুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
সিরামিক উৎপাদনের মূলনীতি হলো প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত অজৈব ও অধাতব খনিজ উপাদানকে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে, উপযুক্ত রূপ দিয়ে এবং উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে স্থায়ী ও মজবুত কাঠামোয় রূপান্তর করা।
- চীনামাটি বা কেওলিন (Al2O3·2SiO2·2H2O): সিরামিকের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং নরম অবস্থায় প্লাস্টিসিটি (নমনীয়তা) প্রদান করে।
- কোয়ার্টজ বা সিলিকা (SiO2): তাপ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, কাঠামো শক্ত করে এবং শুকানোর সময় সংকোচন রোধ করে।
- ফেল্ডস্পার (K2O·Al2O3·6SiO2): ফ্লাক্স হিসেবে কাজ করে, যা কম তাপমাত্রায় গলে অন্যান্য উপাদানকে পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করে।
সিরামিকস প্রস্তুতির কাঁচামাল [ক্লে বা কেওলিন (Al2O3·2SiO2·2H2O), সিলিকা (SiO2) এবং ফেল্ডস্পার (K2O·Al2O3·6SiO2)]-এর আনুপাতিক মিশ্রণকে চুল্লিতে 600°–650°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে সিরামিকসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্লে থেকে কেলাস পানি অপসারিত হয়ে অ্যালুমিনা (Al2O3) এবং সিলিকার (SiO2) অদানাদার মিশ্রণ তৈরি হয়:
এরপর 940°C তাপমাত্রায় অদানাদার অ্যালুমিনা প্রচুর তাপ উদগিরণ করে দানাদার অ্যালুমিনায় রূপান্তরিত হয়।
প্রায় 1000°C তাপমাত্রায় দানাদার অ্যালুমিনা (Al2O3) এবং সিলিকা (SiO2) মিশ্রণটি ফেল্ডস্পার (K2O·Al2O3·6SiO2)-এর উপস্থিতিতে বিগলিত হয়ে মুলাইট (Mullite, 3Al2O3·2SiO2) গঠন করে:
তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়ে 1400°–1500°C হলে অবশিষ্ট সিলিকা (SiO2) কেলাসিত হয়ে ক্রিস্টোবেলাইট (Cristobalite) নামক দানাদার কাঠামোয় পরিণত হয়। এভাবে উৎপন্ন মুলাইট এবং ক্রিস্টোবেলাইটের মিশ্রণ (বিস্কুট) তথা সিরামিক উৎপন্ন হয়:
(i), (ii) ও (iii) নং বিক্রিয়া যোগ করলে সামগ্রিক মোট বিক্রিয়াটি নিম্নরূপ দাঁড়ায়:
কাঁচামালগুলোকে নির্ধারিত অনুপাতে মেপে বল মিলে (Ball Mill) পানির সাথে মিশিয়ে মিহি গুঁড়ো করা হয়। এর ফলে তরল কাদার মতো সমসত্ত্ব মিশ্রণ তৈরি হয়, যাকে স্লিপ (Slip) বলা হয়। অতিরিক্ত পানি দূর করতে এটি ফিল্টার প্রেসে পাঠানো হয়।
পণ্যের ধরন অনুযায়ী কাদাকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে আকার দেওয়া হয়:
- স্লিপ কাস্টিং: তরল কাদা প্লাস্টার অব প্যারিসের ছাঁচে ঢেলে ফাঁপা সামগ্রী (যেমন: ফুলদানি, বেসিন) তৈরি করা হয়।
- জিগারিং ও জলিং: ঘূর্ণায়মান ডাই এবং টুলের মাধ্যমে গোলাকার পাত্র যেমন থালা, বাটি ইত্যাদি তৈরি করা হয়।
- হাইড্রোলিক প্রেসিং: গুঁড়ো উপাদানকে উচ্চ চাপে ডাই-এর মধ্যে চেপে টাইলস তৈরি করা হয়।
আকার দেওয়ার পর বস্তুতে থাকা আর্দ্রতা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় শুকানো হয়। দ্রুত শুকাতে গেলে সামগ্রীতে ফাটল ধরার ঝুঁকি থাকে। শুকানোর পর এই কাঁচা রূপটিকে বলা হয় গ্রিনওয়্যার (Greenware) বা ব্লাংক (Blank)।
গ্রিনওয়্যার (Greenware) বা ব্লাংককে (Blank) ভাটিতে (Kiln) প্রায় ৯০০°C থেকে ১০০০°C তাপমাত্রায় প্রথমবার পোড়ানো হয়। এই ধাপে কাদার জৈব উপাদান পুড়ে যায়, রাসায়নিকভাবে যুক্ত পানি বাষ্পীভূত হয় এবং বস্তুটি শক্ত ও ছিদ্রযুক্ত (Porous) কাঠামো পায়। একে বিস্কুট (Bisque) বলা হয়।
সিরামিক সামগ্রীকে মসৃণ, কাচের মতো চকচকে এবং জলরোধী করার জন্য গ্লেজের পাতলা আবরণ দেওয়া হয়। গ্লেজ মূলত সিলিকা, ফ্লাক্স, লবণ (NaCl) এবং কালারিং অক্সাইড [যেমন: CoO (নীল), Cr2O3 (সবুজ), Fe2O3 (বাদামী), MnO2 (বেগুনি)]-এর সূক্ষ্ম তরল মিশ্রণ। বিস্কুট সামগ্রীটি গ্লেজ মিশ্রণে ডুবিয়ে অথবা স্প্রে করে প্রলেপ দেওয়া হয়।
গ্লেজযুক্ত সামগ্রীকে দ্বিতীয়বার উচ্চ তাপমাত্রায় (প্রায় ১২০০°C থেকে ১৩৫০°C) পোড়ানো হয়। উচ্চ তাপে গ্লেজ গলে পুরো বস্তুর ওপর একটি নিরবচ্ছিন্ন কাচের স্তর তৈরি করে এবং মূল কাঠামোর সাথে স্থায়ী রাসায়নিক বন্ধন গঠন করে।
উত্তর: উচ্চ তাপমাত্রায় (1600°C) সিরামিক সামগ্রীর ওপর NaCl ছিটিয়ে গ্লেজিং করা হয়। এক্ষেত্রে চুল্লিতে থাকা স্টিমের (জলীয় বাষ্প) উপস্থিতিতে NaCl বিয়োজিত হয়ে সোডিয়াম অক্সাইড (Na2O) ও হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl) গ্যাস উৎপন্ন করে:
উৎপন্ন Na2O, সিরামিকের সিলিকা (SiO2)-এর সাথে মিশে গলিত সোডিয়াম সিলিকেট (Na2SiO3) তৈরি করে, যা সিরামিক সামগ্রীতে থাকা সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দেয়। এতে সিরামিক সামগ্রীগুলো মসৃণ হয় এবং কাচের মতো চকচক করে।
