রাদারফোর্ডের আলফা কণা পরীক্ষা,স্বীকার্য ও সীমাবদ্ধতা এবং তুলনা
১৮৯৭ সালে স্যার জে. জে. থমসন কর্তৃক ইলেকট্রন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন জানার জন্য নানাবিধ গবেষণা শুরু করেন। ১৮৯৭ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীদের দেওয়া পরমাণুর গঠনের ব্যাখ্যাসমূহ পরমাণু মডেল নামে পরিচিত।
| ক্র. | মডেলের নাম | প্রবক্তা | প্রকাশের সাল |
|---|---|---|---|
| ১. | প্লাম পুডিং মডেল | স্যার জে. জে. থমসন | ১৮৯৮ |
| ২. | রাদারফোর্ড পরমাণু মডেল | আর্নেস্ট রাদারফোর্ড | ১৯১১ |
| ৩. | বোর পরমাণু মডেল | নিলস বোর | ১৯১৩ |
| ৪. | বোর-সোমারফিল্ড পরমাণু মডেল | আরনল্ড সোমারফিল্ড | ১৯১৬ |
| ৫. | কোয়ান্টাম বলবিদ্যা পরমাণু মডেল | ডি-ব্রগলি, শ্রোডিঙ্গার, হাইজেনবার্গ | ১৯২৪ |
উত্তর:
১৯১১ সালে বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এই যুগান্তকারী পরীক্ষাটি সম্পন্ন করেন। পরীক্ষায় ব্যবহৃত উপকরণসমূহ:
- α-কণার উৎস: তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বিসমাথ (21483Bi) থেকে নির্গত তীব্র গতিসম্পন্ন দ্বি-ধনাত্মক হিলিয়াম নিউক্লিয়াস (42He2+)।
- পাতলা সোনার পাত: অত্যন্ত পাতলা স্বর্ণপাত, যার পুরুত্ব মাত্র 0.0004 cm (বা 4 × 10−5 cm / 4 × 10−7 m)।
- প্রতিপ্রভা সৃষ্টিকারী পর্দা: স্বর্ণপাতের পেছনে রাখা বৃত্তাকার জিংক সালফাইড (ZnS) প্রলেপযুক্ত পর্দা।
- একটি বায়ুশূন্য আবদ্ধ পাত্রে রাখা অত্যন্ত পাতলা স্বর্ণপাতের ওপর তীব্র গতিসম্পন্ন α-রশ্মি ফেলা হয়।
- স্বর্ণপাতের পেছনে রাখা বৃত্তাকার পর্দায় কোনো α-কণা এসে আঘাত করলে সেখানে ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু বা উজ্জ্বল স্ফুলিঙ্গ (Scintillation) সৃষ্টি হয়।
- বৃত্তাকার পর্দায় সৃষ্ট এই স্ফুলিঙ্গের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে সোনার পাত ভেদ করে যাওয়া α-কণাসমূহের গতিপথ ও দিক পরিবর্তন সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা হয়।
- অধিকাংশ কণার সরল গতি: প্রায় ৯৯% α-কণা কোনো বাধা না পেয়ে সোজা স্বর্ণপাত ভেদ করে পেছনের পর্দায় গিয়ে আঘাত করে।
- সামান্য বিক্ষেপণ: খুব কম সংখ্যক α-কণা তাদের সোজা পথ থেকে সামান্য কোণে বেঁকে বা বিক্ষিপ্ত হয়ে বেরিয়ে যায়।
- বিপরীতমুখী প্রত্যাবর্তন: অতি অল্প সংখ্যক α-কণা (প্রায় ২০,০০০ টির মধ্যে মাত্র ১টি) ৯০° বা তার চেয়ে বেশি কোণে, এমনকি কিছু কণা ১৮০° কোণে পুরোপুরি পেছনের দিকে ফিরে আসে।
১. পরমাণুর অধিকাংশ স্থান ফাঁকা:
যেহেতু প্রায় ৯৯% α-কণাই কোনো বাধা না পেয়ে সোজা চলে যায়, তাই প্রমাণিত হয় যে পরমাণুর অভ্যন্তরে অধিকাংশ স্থানই সম্পূর্ণ ফাঁকা।
২. নিউক্লিয়াসের আবিষ্কার ও অবস্থান:
যেহেতু α-কণা ভারী ও ধনাত্মক আধানযুক্ত (42He2+), তাই এটি বিপরীত দিকে ফিরে আসার একমাত্র কারণ সেখানে সমধর্মী ধনাত্মক আধানের সাথে তীব্র বিকর্ষণ বল তৈরি হওয়া। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে এর সমগ্র ধনাত্মক আধান এবং প্রায় সম্পূর্ণ ভর পুঞ্জীভূত থাকে। এই ভারী ও ধনাত্মক কেন্দ্রকে নিউক্লিয়াস বলা হয়।
৩. ইলেকট্রনের প্রভাবহীনতা:
ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের বাইরে ফাঁকা স্থানে অবস্থান করে। একটি α-কণার ভর একটি ইলেকট্রনের ভরের তুলনায় প্রায় ৭,৩০০ থেকে ৭,৫০০ গুণ বেশি। ফলে অতি হালকা ইলেকট্রনগুলো ভারী ও দ্রুতগামী α-কণার গতিপথে কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি করতে পারে না।
৪. পরমাণুর তুলনায় নিউক্লিয়াসের অতি ক্ষুদ্র আকার:
পরমাণুর সামগ্রিক ব্যাস প্রায় 10−8 cm (বা 10−10 m) হলেও এর নিউক্লিয়াসের ব্যাস মাত্র 10−13 cm থেকে 10−12 cm (বা 10−15 m থেকে 10−14 m)। অর্থাৎ, সমগ্র পরমাণুর তুলনায় এর কেন্দ্রস্থ নিউক্লিয়াসটি প্রায় ১০ হাজার থেকে ১ লক্ষ গুণ ছোট।
উত্তর:
- পরমাণু অত্যন্ত ক্ষুদ্র গোলাকৃতি কণা বিশেষ। এটি প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত:
(i) কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস
(ii) কেন্দ্র-বহির্ভূত অঞ্চল। - প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্রে একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ধনাত্মক আধানযুক্ত ভারী অংশ থাকে, যাকে নিউক্লিয়াস বলে।
- নিউক্লিয়াসে পরমাণুর সমস্ত ধনাত্মক চার্জ ও প্রায় সমগ্র ভর পুঞ্জীভূত থাকে। তাই মোটামুটিভাবে নিউক্লিয়াসের ভরই পারমাণবিক ভর এবং পরমাণুর অভ্যন্তরের বেশিরভাগ স্থানই ফাঁকা।
- সৌরজগতে সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান গ্রহসমূহের মতো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারদিকে কতগুলো ঋণাত্মক কণিকা সর্বদা ঘূর্ণায়মান; এগুলোকে ইলেকট্রন বলে।
- পরমাণুর সামগ্রিক আকারের (ব্যাস প্রায় 10−10 m) তুলনায় এর কেন্দ্রস্থ নিউক্লিয়াসের আকার অত্যন্ত নগণ্য (ব্যাস প্রায় 10−15 m), যা সামগ্রিক পরমাণুর চেয়ে প্রায় ১ লক্ষ গুণ ছোট।
- সাধারণ অবস্থায় পরমাণু বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ। কারণ নিউক্লিয়াসে বিদ্যমান ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন সংখ্যা এবং এর চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন সংখ্যা পরস্পর সমান ও বিপরীতধর্মী।
- সৌরজগতের গ্রহগুলোর মতো ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রস্থ নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে অবিরাম বৃত্তাকার পথে ঘোরে; এ সময় ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রবিমুখী বল এবং নিউক্লিয়াস-ইলেকট্রনের মধ্যকার স্থির-বৈদ্যুতিক কেন্দ্রমুখী আকর্ষণ বল সমান ও বিপরীতমুখী হওয়ায় ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসে আছড়ে পড়ে না বা কক্ষচ্যুত হয় না।
- তড়িৎ আধানহীন গ্রহের সাথে তুলনা: সৌরজগতের সূর্য ও গ্রহগুলো সামগ্রিকভাবে চার্জহীন বা তড়িৎ-নিরপেক্ষ এবং তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া কেবল মহাকর্ষ বল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে পরমাণুর নিউক্লিয়াস ধনাত্মক এবং ইলেকট্রনগুলো ঋণাত্মক চার্জযুক্ত। ফলে এদের মধ্যে স্থির-বৈদ্যুতিক আকর্ষণ ও পারস্পরিক বিকর্ষণ কাজ করে। চার্জহীন গ্রহের সাথে চার্জযুক্ত পারমাণবিক কণিকার তুলনা করা তাত্ত্বিকভাবে সঠিক নয়।
- ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বানুসারে পরমাণুর অস্তিত্ব সংকট: ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বানুসারে, কোনো চার্জযুক্ত কণা অপর কোনো চার্জযুক্ত কণাকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার পথে ঘুরলে তা অবিরতভাবে শক্তি বিকিরণ করতে থাকবে। শক্তি হ্রাসের সাথে সাথে ইলেকট্রনের আবর্তনশীল পথ সংকুচিত হয়ে সর্পিলাকারে একসময় নিউক্লিয়াসে পতিত হওয়ার কথা, যা পরমাণুর অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করত। কিন্তু বাস্তবে পরমাণু থেকে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি বিকিরণ বা নিউক্লিয়াসে ইলেকট্রনের পতন—কোনোটিই ঘটে না; পরমাণু অত্যন্ত সুস্থিত।
- পারমাণবিক বর্ণালীর ব্যাখ্যায় ব্যর্থতা: পরমাণু থেকে কীভাবে বর্ণালী (রেখা বর্ণালী) সৃষ্টি হয়, এ মডেল থেকে তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
- কক্ষপথের আকার ও আকৃতির ধারণাহীনতা: নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘূর্ণনরত ইলেকট্রনের কক্ষপথের আকার (ব্যাসার্ধ) ও জ্যামিতিক আকৃতি সম্বন্ধে রাদারফোর্ডের মডেলে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি।
- একাধিক ইলেকট্রনযুক্ত পরমাণুর বিন্যাস: একাধিক ইলেকট্রনযুক্ত পরমাণুর গঠন এবং ইলেকট্রনগুলো কীভাবে নিউক্লিয়াসের চারপাশে বিন্যস্ত থেকে পরিক্রমণ করে, এ মডেল তা ব্যাখ্যা করতে পারে না।
- হাইড্রোজেনের সূক্ষ্ম রেখা বর্ণালী: একটিমাত্র ইলেকট্রন থাকা সত্ত্বেও হাইড্রোজেন পরমাণু কীভাবে সূক্ষ্ম রেখা বর্ণালী প্রদর্শন করে, তার কোনো ব্যাখ্যা এ মডেল থেকে পাওয়া যায় না।
- কৌণিক ভরবেগ সম্পর্কে অনির্দিষ্টতা: নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তনশীল ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ (mvr) কেমন হবে বা তা নির্দিষ্ট কি না—সে সম্পর্কে এ মডেল থেকে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না।
উত্তর: সৌরজগতের সাথে রাদারফোর্ড মডেলের তুলনামূলক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
| ক্রম | সৌরজগতের বৈশিষ্ট্য | রাদারফোর্ড মডেলের পরমাণুর বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| ১ | কেন্দ্রে সূর্য অবস্থান করে এবং গ্রহগুলো তার চারদিকে নিজ নিজ কক্ষপথে ঘোরে। | কেন্দ্রে নিউক্লিয়াস থাকে এবং ইলেকট্রনগুলো তার চারদিকে অবিরাম ঘোরে। |
| ২ | সূর্যের ভর সমগ্র সৌরজগতের যেকোনো গ্রহের তুলনায় অনেক বেশি। | নিউক্লিয়াসের ভর ইলেকট্রনের ভরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। |
| ৩ | সৌরজগতের কেন্দ্রবিমুখী বল এবং সূর্য-গ্রহের মহাকর্ষ বল সমান বলে গ্রহগুলো স্থির থাকে। | ইলেকট্রনের কেন্দ্রাতিগ বল এবং নিউক্লিয়াস-ইলেকট্রনের স্থির-বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বল সমান। |
| ৪ | সৌরজগতের প্রায় সম্পূর্ণ অংশই ফাঁকা স্থান। | পরমাণুর ভেতরের প্রায় ৯৯% স্থানই ফাঁকা। |
| ক্রম | সৌরজগতের বৈশিষ্ট্য | রাদারফোর্ড মডেলের পরমাণুর বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| ১ | সূর্য ও গ্রহগুলো সম্পূর্ণ তড়িৎ-নিরপেক্ষ (চার্জহীন)। | নিউক্লিয়াস ধনাত্মক (+) এবং ইলেকট্রন ঋণাত্মক (−) আধানবিশিষ্ট। |
| ২ | গ্রহগুলোর মধ্যে কেবল পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল ক্রিয়াশীল। | ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের মধ্যে স্থির-বৈদ্যুতিক আকর্ষণ এবং ইলেকট্রনগুলোর নিজেদের মধ্যে তীব্র বিকর্ষণ বল থাকে। |
| ৩ | প্রতিটি কক্ষপথে সুনির্দিষ্টভাবে কেবল একটি গ্রহ ঘোরে। | পরমাণুর একই শক্তিস্তরে বা কক্ষপথে একাধিক ইলেকট্রন অবস্থান করতে পারে। |
Tag:আলফা কণা পরীক্ষা, তুলনা, সীমাবদ্ধতা, স্বীকার্য
