সবুজ রসায়নের মূলনীতি ও এর গাণিতিক সমস্যার সমাধান
সবুজ রসায়ন (Green Chemistry)
সবুজ রসায়ন হলো রসায়নের একটি শাখা যাতে কম পরিবেশ দূষণ করে এবং ঝুঁকি হ্রাস করে এমন রাসায়নিক প্রক্রিয়া বা উৎপাদন-পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা হয়। কার্যত সবুজ রসায়ন এমন একটি গবেষণাদর্শন, যার উদ্দেশ্য এমন রাসায়নিক পদ্ধতির উদ্ভাবন ও অবলম্বন করা যাতে শিল্পজাত বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাস পায়, ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার হ্রাস পায় এবং শক্তির অপচয় হ্রাস পায়। এটি রসায়নের একটি নবতর শাখা।
সবুজ রসায়নের মূলনীতি
১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী পল টি অ্যানাস্তাস এবং জন সি ওয়ারনার সবুজ রসায়নের বিষয়টি প্রস্তাব করেন। এতে সবুজ রসায়নের ১২টি মূলমন্ত্র রয়েছে। যথা:
- বর্জ্য পদার্থ রোধকরণ
- সর্বোত্তম অ্যাটম ইকনমি
- ন্যূনতম ঝুঁকির পদ্ধতির ব্যবহার
- নিরাপদ কেমিক্যাল পরিকল্পনা
- নিরাপদ দ্রাবক ব্যবহার
- বিক্রিয়ার শক্তি দক্ষতা পরিকল্পনা
- নবায়নযোগ্য কাঁচামাল ব্যবহার
- ন্যূনতম উপজাতক
- প্রভাবক প্রয়োগ
- প্রাকৃতিক রূপান্তর পরিকল্পনা
- যথাসময়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ
- দুর্ঘটনা প্রতিরোধ
উদাহরণ
সবুজ রসায়ন এর প্রয়োগকে ব্যাখ্যা করে, এমন কয়েকটি উদাহরণ এখানে আলোচনা করা হল। ২০০৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় “জৈব রসায়নে মেটাথেসিস মেথড” আবিষ্কারের জন্যে। এর সাহায্যে অনেক “স্মার্ট” জিনিস তৈরি করা যাবে সবুজ রসায়ন এর পদ্ধতি মেনে। হাইড্রাজিন নামক এক পদার্থ এই পদ্ধতিতে তৈরি হয়।
কিন্তু সবুজ রসায়নের সাহায্য নিয়ে হাইড্রাজিন নিম্নলিখিত পদ্ধতিতেও তৈরি করা যায়। তা হলো—
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে অ্যামোনিয়ার বদলে হাইড্রোজেন পারক্সাইড ব্যবহার করে হাইড্রাজিন তৈরি করা যায় কারণ এতে জল ছাড়া আর কোনো আনুষঙ্গিক পদার্থ তৈরি হয় না। এ ছাড়াও পলিস্টাইরিন তৈরি করতে ওজোন (O3) এবং সিএফসি (CFC) লাগত “ব্লোইং এজেন্ট” হিসেবে। সবুজ রসায়ন এর পরিবর্তে সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই-অক্সাইড দিয়েও কাজ হচ্ছে।
সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই-অক্সাইড:
সন্ধি তাপমাত্রার নিচে কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিশেষ অবস্থা যেখানে কিছুটা তরলের ন্যায় এবং কিছুটা গ্যাসের ন্যায় আচরণ করে। সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রিন দ্রাবক হিসাবে ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ হ্রাস করা যায়।
অ্যাটম ইকনমি বা পরমাণু অর্থনীতি (Atom Economy)
কোনো বিক্রিয়কের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদের মোট আণবিক ভর এবং বিক্রিয়াটিতে ব্যবহৃত সকল বিক্রিয়কের সংকেতের আণবিক ভরের সমষ্টির অনুপাতকে অ্যাটম ইকনমি বলে। অর্থাৎ—
(i) বিক্রিয়ার এটম ইকনমি (AE) = 29.629 %
(ii) বিক্রিয়ার এটম ইকনমি (AE) = 47.058 %
রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সবুজ রসায়নের প্রয়োগ/উপকারিতা
- মানব স্বাস্থ্য রক্ষায় গ্রিন কেমিস্ট্রি:
- মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর বায়ুদূষণের পরিমাণ কমানো।
- খাবার পানিতে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক বর্জ্যের হ্রাসকৃত পরিত্যাগকরণ।
- খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশযোগ্য দীর্ঘস্থায়ী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের অপসারণ।
- অধিকতর নিরাপদ কীটনাশকের উদ্ভাবন করে ক্ষতিকর কীটনাশক প্রতিস্থাপন করা।
- খাদ্যশৃঙ্খলে যুক্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ অপসারণ করে উপযুক্ত পোকামাকড়ের প্রতি সংবেদনশীল নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
গাণিতিক উদাহরণ
১. ইথানল উৎপাদনের দুটি পদ্ধতি নিম্নরূপ—
i. C6H12O6 → 2C2H5OH + 2CO2
ii. C2H5Br + KOH → C2H5OH + KBr
ইথানল উৎপাদনের কোন পদ্ধতিটি গ্রিন কেমিস্ট্রির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো।
সমাধান:
উদ্দীপকের ১ম বিক্রিয়াটি হলো:
i. C6H12O6 → 2C2H5OH + 2CO2
এখানে বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক হলো গ্লুকোজ (C6H12O6) এবং কাঙ্ক্ষিত উৎপাদ হলো ইথানল (C2H5OH)।
সুতরাং বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক (C6H12O6) পরমাণুসমূহের মোট ভর = {(12 × 6) + (1 × 12) + (16 × 6)} = 180
এবং কাঙ্ক্ষিত উৎপাদের (C2H5OH) পরমাণুসমূহের মোট ভর = 2 × {(12 × 2) + (1 × 5) + 16 + 1} = 92।
উদ্দীপকের ২য় বিক্রিয়াটি হলো:
ii. C2H5Br + KOH → C2H5OH + KBr
এখানে বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক হলো C2H5Br ও KOH এবং কাঙ্ক্ষিত উৎপাদ হলো ইথানল (C2H5OH)।
সুতরাং বিক্রিয়ায় বিক্রিয়কসমূহের পরমাণুসমূহের মোট ভর = {(12 × 2) + (1 × 5) + 80} + {(39 + 16 + 1)} = 165
এবং কাঙ্ক্ষিত উৎপাদের (C2H5OH) পরমাণুসমূহের মোট ভর = {(12 × 2) + (1 × 5) + 16 + 1} = 46।
সিদ্ধান্ত: গ্রিন কেমিস্ট্রির মূলনীতি হলো বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী বিক্রিয়কগুলোকে একীভূত করে সর্বোচ্চ কাঙ্ক্ষিত উৎপাদে পরিণত করা। সে অনুসারে বিক্রিয়া পদ্ধতি দুটির মধ্যে ১ম বিক্রিয়ায় সর্বোচ্চ পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত উৎপাদ পাওয়া যায়। তাই বলা যায় যে, ১ম পদ্ধতিটি গ্রিন কেমিস্ট্রির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২. Green Chemistry অনুসারে সাজাও:
(i) C2H4 + Cl2 + Ca(OH)2 → C2H4O + CaCl2 + H2O
(ii) C2H4 + 0.5O2 → C2H4O
(iii) CH2(OH) – CH2Cl + KOH → C2H4O + KCl + H2O [বুয়েট ২২-২৩]
উত্তর: যে বিক্রিয়ার এটম ইকোনমি যত বেশি সেটি তত বেশি গ্রিনার অর্থাৎ, গ্রিন কেমিস্ট্রিতে সেটি তত বেশি কার্যকরী। অতএব, Green Chemistry অনুসারে সাজালে (ii) > (iii) > (i) ক্রমটি পাওয়া যায়।
[Answer Hints: H, O, Cl, K, Ca এদের পারমাণবিক ভর হলো: 1, 16, 35.5, 39, 40 এবং সূত্র: এটম ইকোনমি (AE) = (কাঙ্ক্ষিত উৎপাদের মোট আণবিক ভর / বিক্রিয়কসমূহের মোট আণবিক ভর) × 100%]
৩. টাইটেনিয়াম দুটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি দ্বারা আকরিক থেকে নিষ্কাশন করা যায়। যথা—
i. অধিকতর সক্রিয় ধাতুর ব্যবহার: TiO2 + 2Mg → Ti + 2MgO
ii. আকরিকের তড়িৎবিশ্লেষণ: TiO2 → Ti + O2
কাঙ্ক্ষিত উৎপাদে বিক্রিয়ক পরমাণুর সর্বাধিক উপস্থিতির ধারণা ব্যবহার করে, উপরের কোন পদ্ধতি গ্রিনার? [Ti = 47.88, Mg = 24.3, O = 16] (বুয়েট ১৮-১৯)
৪. C2H4 (ইথিন) + H2 → C2H6 (ইথেন) বিক্রিয়াটির % এটম ইকোনমি নির্ণয় করো।
উত্তর: 100%
[Answer Hints: H ও C পারমাণবিক ভর হলো: 1 ও 12 এবং সূত্র: এটম ইকোনমি (AE) = (কাঙ্ক্ষিত উৎপাদের আণবিক ভর / বিক্রিয়কসমূহের আণবিক ভরের সমষ্টি) × 100%]
৫. C6H5OH (ফেনল) + Zn → C6H6 + ZnO বিক্রিয়াটির % এটম ইকোনমি নির্ণয় করো।
উত্তর: 48.9%
৬. CH3CH2OH + CH3COOH → CH3COOCH2CH3 + H2O; CH3COOCH2CH3 যৌগটির এটম ইকোনমি কত? (চ. বো. ১৯)
উত্তর: 83%
৭. X (78g) + Y (98g) → M (84g) (উৎপাদ) + N (92g) (বর্জ্য)
উত্তর: 47%
৮. CH3 – CH2 – Br + NaOH(aq) → CH3-CH2-OH + NaBr, বিক্রিয়াটির এটম ইকোনমি কত? (রা. বো. ১৬)
উত্তর: 30%
