ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার এর বিস্তরিত ব্যাখ্যা
| স্তরের নাম | উচ্চতা (km) | তাপমাত্রার সীমা °C | মূখ্য উপাদান |
|---|---|---|---|
| ট্রাপোস্ফিয়ার | ০ হতে ১১ | ১৫ হতে -৫৬ | N₂, O₂, CO₂, H₂O₍g₎ |
| স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার | ১১ হতে ৫০ | -৫৬ হতে -২ | O₃ |
| মেসোস্ফিয়ার | ৫০ হতে ৮৫ | -২ হতে -৯২ | O₂⁺, NO⁺ |
| থার্মোস্ফিয়ার | ৮৫ হতে ৫০০ | -৯২ হতে ১২০০ | O₂⁺, O⁺, NO⁺ |
চিত্র-: বায়ুমন্ডলের স্তরসমূহ
পরিচিতি: ভূ-পৃষ্ঠের নিকটবর্তী স্তরকে ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere) বলে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমন্ডলের সর্বনিম্ন স্তরটিকে ট্রপোস্ফিয়ার বলে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- এ স্তরে নিচের দিকে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকে। তাই মেঘ, বৃষ্টিপাত, বজ্রপাত, বায়ুপ্রবাহ, ঝড়, শিশির, কুয়াশা, তুষারপাত সবই এ স্তরে ঘটে। এ জন্য বায়ুমন্ডলের এই অবস্থা-ই আবহাওয়া ও জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- ভূ-পৃষ্ঠ থেকে যত উপরে উঠা যায় বায়ুর ঘনত্ব ও তাপমাত্রা দুটোই হ্রাস পায়। এর বিস্তৃতি ০-১১ km, তাপমাত্রা +১৫°C থেকে -৫৬°C এবং বায়ুর চাপ ২০০ mm(Hg) থেকে ১০০ mm(Hg) পর্যন্ত।
- ট্রপোস্ফিয়ারে অঞ্চলে উত্তাপের সবচেয়ে বেশি ব্যাতিক্রম দেখা যায়।
- তাপ ও চাপের পার্থক্যের কারণে এখানে বায়ু প্রবাহের সৃষ্টি হয়।
- বায়ুর ঘনত্ব এ স্তরে বেশি থাকে এবং আবহাওয়া সৃষ্টিকারী প্রায় ৯৭% উপাদান এখানে বিদ্যমান।
- এটি স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের সাথে মিশে গেছে; দুই স্তরের মধ্যবর্তী পরিবর্তন স্থানটিকে ট্রপোপজ বা ট্রপবিরতি (Trapopause) বলে।
বায়ুমন্ডলের উপাদানসমূহ (ট্রপোস্ফিয়ার):
| উপাদান | শতকরা পরিমাণ (%) |
|---|---|
| নাইট্রোজেন (N₂) | ৭৮.০৮ |
| অক্সিজেন (O₂) | ২০.৯৪ |
| জলীয় বাষ্প (H₂O) | ১-৪ |
| আর্গন (Ar) | ০.৯৩ |
| কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) | ০.০৩ |
| নিয়ন (Ne) | ০.০০১৮ |
| হিলিয়াম (He) | ০.০০০৫ |
| মিথেন (CH₄) | ০.০০০১৮ |
| ক্রিপ্টন (Kr) | ০.০০০১১ |
| নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) | ০.০০০৩ |
| হাইড্রোজেন (H₂) | ০.০০০৫ |
| ওজোন (O₃) | ০.০০০৫ |
| কার্বন মনোক্সাইড (CO) | ০.০০০১ |
| আয়োডিন (I₂) | ০.০০০০০১ |
| নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (NO₂) | ০.০০০০০০২ |
- ১. স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অঞ্চলে কোন জলীয় বাষ্প থাকে না। তাই মেঘ, বৃষ্টিপাত, বজ্রপাত, বায়ুপ্রবাহ, ঝড়, শিশির, কুয়াশা, তুষারপাত কোনটির এই স্তরে সংঘটিত হয় না। অর্থাৎ স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অঞ্চল একটি মেঘমুক্ত অঞ্চল। এ স্তরে কোনো ঝড়-বৃষ্টি থাকে না বলে এর মধ্য দিয়ে সাধারণত জেট বিমান চলাচল করে।
- ২. এ স্তরের বিস্তৃতি বা উচ্চতা ১১ km থেকে ৫০ km পর্যন্ত। এ অঞ্চলের তাপমাত্রা -৫৬°C থেকে -২°C পর্যন্ত এবং বায়ুর চাপ ১০০ mm(Hg) থেকে ১ mm(Hg) পর্যন্ত।
- ৩. এ স্তরে ৩-৫ km পুরু ওজোন গ্যাসের ওজোন স্তর (ozonelayer) বিদ্যমান, যা পৃথিবী পৃষ্ঠে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি প্রবেশে বাধা প্রদান করে। ওজোন হলো এই স্তরের প্রধান রাসায়নিক পদার্থ।
- ৪. এ স্তরে তাপমাত্রার পরিবর্তন ট্রপোমন্ডলের ঠিক বিপরীত (উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়)।
- ৫. এ স্তরে বায়ু ঘনত্ব ও চাপ উভয়ই কম থাকে।
- ৬. এ স্তরে আবহাওয়া থাকে শুষ্ক ও শান্ত। তাই এ স্তরকে শান্তমন্ডলও বলা হয়।
- ৭. এ স্তরে বায়ু অত্যন্ত হালকা প্রকৃতির হয়ে থাকে এবং কোনরূপ তাপ ও চাপের পার্থক্য দেখা যায় না।
- ৮. এ স্তরের বায়ুর উর্ধ্বগতি ও নিম্নগতি নেই এবং বায়ুপ্রবাহ ক্ষীণ ও সমান্তরাল প্রকৃতির হয়ে থাকে।
- ৯. স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারই হলো উর্ধ্ব আকাশ।
- ১. মেসোস্ফিয়ার অঞ্চলে কোনো সৌর বিকিরণকারী রাসায়নিক উপাদান থাকে না।
- ২. এ স্তরে বায়ুর ঘনত্ব অনেক কম থাকে।
- ৩. এ স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাপমাত্রা হ্রাস পায়। অর্থাৎ -২°C থেকে –৯২°C পর্যন্ত। এর উচ্চতা ৫০–৮৫ km এবং বায়ুর চাপ ০.১ mm(Hg) থেকে ০.০০০১ mm(Hg) পর্যন্ত।
- ৪. এই স্তরের কারণেই উল্কাপিন্ডগুলো ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না।
- ৫. এই স্তরের রাসায়নিক পদার্থগুলো আয়নিত অবস্থায় থাকে। যেমন: O₂⁺ এবং NO⁺।
ঘ) থার্মোস্ফিয়ার বা তাপমন্ডল (Thermosphere)
বায়ুমন্ডলের মেসোস্ফিয়ারের পরবর্তী স্তরটিকে তথা চতুর্থ স্তরটিকে থার্মোফিয়ার বলে পরিচিত যা মেসোপজ নামক পাতলা আবরণ দ্বারা বিভক্ত। থার্মোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ারের মধ্যবর্তী সীমানাকে ম্যাসোপজ (Masopause) বা ম্যাসোবিরতি বলে।
থার্মোস্ফিয়ারের নিচের অংশ আয়নোস্ফিয়ার বা আয়নমন্ডল (Ionosphere) এবং উপরের অংশ এক্সোস্ফিয়ার (Exosphere) ও ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (Magnetosphere)।
- ১। এ স্তরে বায়ুর চাপ ও ঘনত্ব অতি নিম্ন।
- ২। এ স্তরে জলীয় বাষ্পের অবস্থান অস্বাভাবিক বলে মনে হয়।
- ৩। বায়ুমন্ডলের এ স্তরেই বিদ্যুৎ চমকায়।
- ৪। আয়নোস্ফিয়ার এর উর্ধ্বস্তরে উল্কা ও কসমিক কণার সন্ধান পাওয়া যায়।
- ৫। এ স্তরটিতে পারমাণবিক অক্সিজেনের ঘনত্ব আণবিক অক্সিজেন অপেক্ষা বেশি।
আয়নোস্ফিয়ার অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত অতিবেগুনি রশ্মি ও মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাবে অক্সিজেন ও নাইট্রিক এসিড আয়নিত হয়ে যথাক্রমে O+ ও NO+ রূপে অবস্থান করে।
(ক) পরিচিতি: বায়ুমন্ডলের থার্মোস্ফিয়ারের উপরের অংশকে এক্সোস্ফিয়ার এবং এক্সোস্ফিয়ারের উপরে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলকে বেষ্টনকারী একটি চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে। যাকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চৌম্বক মন্ডল বলে। এক্ষেত্রে বায়ুমন্ডলকে ঘিরে প্রোটন ও ইলেকট্রনের সমন্বয়ে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়।
উচ্চতা বা বিস্তৃতি: National Aeronautics and Space Administration (NASA) এর তথ্য অনুসারে, 660 km থেকে 10,000 km উচ্চতা পর্যন্ত উপরে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার অবস্থিত।
তাপমাত্রা: এক্সোস্ফিয়ার স্তরেও উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ স্তরের তাপমাত্রা পরিসর হল 200°C থেকে 1700°C পর্যন্ত।
- ১। এ স্তরে বায়ুর ঘনত্ব অত্যন্ত কম।
- ২। সৌর বিকিরণের কারণে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি।
- ৩। বায়ুমন্ডলের এ স্তরেই বিদ্যুৎ চমকায়।
- ৪। আয়নোস্ফিয়ারের উর্ধ্বস্তরে উল্কা ও কসমিক কণার সন্ধান পাওয়া যায়।
- ৫। এক্সোস্ফিয়ার স্তরটিতে পারমাণবিক অক্সিজেনের ঘনত্ব আণবিক অক্সিজেন অপেক্ষা বেশি।
এক্সোস্ফিয়ার অঞ্চলে রাসায়নিক পদার্থরূপে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম অবস্থান করে।
গ্যাসীয় উপাদানের সংযুক্তির ভিত্তিতে বায়ুমন্ডলের গঠন
ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মহাশূন্যের দিকে বিভিন্ন গ্যাসের অনুপাত অনুসারে বায়ুমণ্ডলকে দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো: ক) সমমন্ডল (Homosphere) এবং খ) বিষমমন্ডল (Heterosphere)।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 85 km উচ্চতা পর্যন্ত এ মন্ডল বিস্তৃত। এ স্তরের সর্বত্র বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদানগুলির অনুপাত মোটামুটিভাবে সমান থাকে, তাই একে সমমন্ডল বা হোমোস্ফিয়ার বলে। এ স্তরে সর্বত্র 78.08% নাইট্রোজেন ও 20.94% অক্সিজেন থাকে। এ ছাড়াও সর্বত্র আর্গন, নিয়ন, ক্রিপ্টন, জেনন ও ওজন থাকে।
সমমন্ডলকে তাপমাত্রা ও উচ্চতা অনুসারে তিনটি অসমান উপস্তরে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন: ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ার।
সমমন্ডলের পরের স্তরটিকে বিষমমন্ডল বা হেটেরোস্ফিয়ার বলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে 85 km উচ্চতা থেকে 10000 km পর্যন্ত এ অঞ্চল বিস্তৃত থাকে। এই স্তরের বিভিন্ন অংশে গ্যাসীয় উপাদানগুলির অনুপাত সমান হয় না, তাই একে বিষমমন্ডল বলে। মৌলিক পদার্থের পরিমাণের তারতম্য অনুসারে বিষমমন্ডলকে চারটি উপস্তরে ভাগ করা হয়েছে। যেমন:
- ১। পারমাণবিক নাইট্রোজেন স্তর: 85–200 km
- ২। পারমাণবিক অক্সিজেন স্তর: 200 – 1100 km
- ৩। হিলিয়াম স্তর: 1100 – 3500 km
- ৪। হাইড্রোজেন স্তর: 3500 – 10,000 km
আবার আয়নিত মাত্রা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনুসারে বিষমমন্ডলকে তিনটি উপস্তরে ভাগ করা হয়েছে। যেমন:
- ১। আয়নোস্ফিয়ার: 100-300 km (আনুমানিক)
- ২। এক্সোস্ফিয়ার: 300-1,000 km (আনুমানিক)
- ৩। ম্যাগনেটোস্ফিয়ার: 1,000 km উর্ধ্বসীমা অনির্দিষ্ট (আনুমানিক)
আয়োনোস্ফিয়ারকে পুনরায় বিভিন্ন ছোট ছোট বলয়ে বিভক্ত করা যায়, কেননা এই ক্ষুদ্র স্তরগুলির বেতার তরঙ্গ প্রতিফলিত করা এবং মেরুপ্রভাব (Aurora) সৃষ্টি করার ক্ষমতা আলাদা। বিষমমন্ডলের উপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার কাজ চলছে। এ স্তরের বেতার তরঙ্গ প্রতিফলিত করার প্রাকৃতিক সুবিধাকে মানব কল্যাণে ব্যবহার করার কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যায় বিশদ অনুসন্ধানের ফলে সম্পদ সৃষ্টি ও সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিষমমন্ডল কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
