বোর পরমাণুর মডেল ও সীমাবদ্ধতা
ম্যাক্স প্লাঙ্কের বিকিরণ কোয়ান্টাম তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পরমাণুর গঠন এবং একই সাথে পারমাণবিক বর্ণালী ব্যাখ্যার জন্য নীলস বোর ১৯১৩ সালে তাঁর বিখ্যাত পরমাণু মডেল প্রকাশ করেন। বোর পরমাণু মডেলের প্রধান তিনটি স্বীকার্য হচ্ছে—
পরমাণুতে যেসব ইলেকট্রন থাকে তারা নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ইচ্ছামতো যেকোনো বৃত্তাকার কক্ষপথে বিচরণ করতে পারে না; কেবলমাত্র কতগুলো নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের অনুমোদিত বৃত্তাকার কক্ষপথে কোনো রূপ শক্তি বিকিরণ না করে অনবরত ঘুরতে থাকে। এই কক্ষপথগুলোকে স্থির কক্ষপথ বা শক্তিস্তর বলে।
শক্তিস্তর নির্দেশকারী এই সংখ্যাগুলোকে প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা (n) বলে। এই শক্তিস্তরগুলোকে n = 1, 2, 3… ইত্যাদি পূর্ণ সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও এই শক্তিস্তরগুলোকে ইংরেজি বর্ণমালার K, L, M, N… ইত্যাদি প্রতীক দ্বারাও প্রকাশ করা হয়। নিউক্লিয়াস হতে যত দূরে যাওয়া যায়, কক্ষপথের শক্তি ততই বৃদ্ধি পায় (K < L < M < N)।
চিত্র ১: পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে অনুমোদিত স্থির বৃত্তাকার কক্ষপথ বা শক্তিস্তরসমূহ (K, L, M, N…)
কোনো নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগের মান নির্দিষ্ট এবং তা h2π এর পূর্ণসংখ্যার সরল গুণিতক। অর্থাৎ কৌণিক ভরবেগ কোয়ান্টায়িত।
যদি একটি ইলেকট্রনের ভর m, বৃত্তাকার কক্ষপথের ব্যাসার্ধ r এবং ঐ কক্ষপথে ইলেকট্রনের রৈখিক বেগ v হয়, তবে এর কৌণিক ভরবেগ হবে:
এখানে, n = প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা (n = 1, 2, 3…) এবং h = প্লাঙ্কের ধ্রুবক (h = 6.626 × 10−34 J·s বা 6.624 × 10−34 J·s)।
নির্দিষ্ট বৃত্তাকার কক্ষপথের যেকোনো একটিতে বিচরণকালে ইলেকট্রন কোনো শক্তি বর্জনও করে না, শোষণও করে না। অর্থাৎ এই কক্ষপথগুলিতে ইলেকট্রন স্থির না থাকলেও এদের শক্তি স্থির থাকে। ইলেকট্রন এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে স্থানান্তরিত হলেই কেবল শক্তির শোষণ বা বিকিরণ ঘটে।
- উচ্চ শক্তিস্তর (যার শক্তি E2) হতে নিম্ন শক্তিস্তরে (যার শক্তি E1) স্থানান্তরিত হলে শক্তি বিকিরিত হয়, যার পরিমাণ হবে: (E2 − E1)।
- আবার নিম্ন শক্তিস্তর (যার শক্তি E1) হতে উচ্চ শক্তিস্তরে (যার শক্তি E2) স্থানান্তরিত হলে শক্তি শোষিত হয়, যার পরিমাণ হবে: (E2 − E1)।
অতএব, শোষিত বা বিকিরিত শক্তিকে নিম্নের সমীকরণের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়:
[এখানে, ν = বিকিরিত আলোর কম্পাঙ্ক, c = আলোর বেগ এবং λ = বিকিরিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য]
চিত্র ২: এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে ইলেকট্রন স্থানান্তরে শক্তি শোষণ, বিকিরণ ও পারমাণবিক বর্ণালী সৃষ্টি
- এই মডেল যেসব পরমাণু বা আয়নে একটিমাত্র ইলেকট্রন থাকে (যেমন— H, He+, Li2+) তাদের বর্ণালী ব্যাখ্যা করতে পারলেও একাধিক ইলেকট্রন বিশিষ্ট পরমাণুসমূহের বর্ণালী ব্যাখ্যা করতে পারে না।
- ইলেকট্রন যখন এক শক্তিস্তর হতে অপর শক্তিস্তরে স্থানান্তরিত হয় তখন বোর পরমাণু মডেল অনুসারে বর্ণালিতে একটি করে রেখা সৃষ্টি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অধিকতর সূক্ষ্ম বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করলে দেখা যায়, পারমাণবিক বর্ণালির প্রতিটি রেখা একাধিক সূক্ষ্ম রেখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে (Fine structure)। বোরের মতবাদ এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না (অবশ্য পরবর্তীতে বোর মতবাদের সম্প্রসারণ করে বিজ্ঞানী সমারফিল্ড এর ব্যাখ্যা প্রদান করেন)।
- বোর মতবাদ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি, চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে বর্ণালী রেখার বিভাজন (জীম্যান প্রভাব / Zeeman Effect) এবং তড়িৎ ক্ষেত্রের প্রভাবে রেখার বিভাজন (স্টার্ক প্রভাব / Stark Effect) ব্যাখ্যা করতে পারে না।
- বোর মডেল দ্বারা শক্তিস্তরের ইলেকট্রনগুলো কেন নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি বিকিরণ করবে বা শক্তি শোষণ করবে তার গভীর কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না।
- কোনো ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগের মান কেন ঠিক h2π এর সমান বা পূর্ণসংখ্যার সরল গুণিতক (nh / 2π) হবে, তার সন্তোষজনক কারণ এ মডেল দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না।
- ক. পরমাণুর কেন্দ্রে ধনাত্মক চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াস বিদ্যমান।
- খ. পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে ইলেকট্রন নামক ঋণাত্মক কণিকা সর্বদা ঘূর্ণায়মান।
- গ. নিউক্লিয়াসে বিদ্যমান ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন সংখ্যা এবং উহার চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন সংখ্যা পরস্পর সমান বলে পরমাণু বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ।
- ঘ. পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনের মধ্যে বিরাজিত কেন্দ্রমুখী স্থির-বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বল এবং ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রবিমুখী বলের মান পরস্পর সমান ও বিপরীতমুখী।
- ক. ইলেকট্রনের স্থির কক্ষপথ বা শক্তিস্তর সম্পর্কিত কোয়ান্টাম ধারণা।
- খ. ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ কোয়ান্টায়িত হওয়া সম্পর্কিত ধারণা।
- গ. ইলেকট্রনের নির্দিষ্ট শক্তি শোষণ, বিকিরণ এবং পারমাণবিক বর্ণালী সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট ধারণা।
| ক্র. | রাদারফোর্ড পরমাণু মডেল | বোর পরমাণু মডেল |
|---|---|---|
| ১ | মডেলটি পরমাণুর চিরায়ত সাধারণ বলবিদ্যার (Classical Mechanics) ওপর প্রতিষ্ঠিত। | মডেলটির মূল ভিত্তি হলো ম্যাক্স প্লাঙ্কের আধুনিক কোয়ান্টাম মতবাদ। |
| ২ | পরমাণুর বর্ণালী সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না। | হাইড্রোজেন ও এক-ইলেকট্রন বিশিষ্ট পরমাণুর রেখা বর্ণালী সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। |
| ৩ | ইলেকট্রনের কক্ষপথের সুনির্দিষ্ট আকার ও আকৃতি সম্বন্ধে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। | ইলেকট্রনের স্থির বৃত্তাকার কক্ষপথের নির্দিষ্ট আকার (ব্যাসার্ধ) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। |
| ৪ | শক্তিস্তরসমূহের মধ্যে ইলেকট্রন স্থানান্তরের ফলে সৃষ্ট বিকিরণ সম্পর্কিত ধারণা এ মডেল থেকে পাওয়া যায় না। | ইলেকট্রনের এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে লাফালাফির ফলে শোষিত বা বিকিরিত আলোক তরঙ্গের শক্তি নির্ণয় করা যায়। |
| ৫ | ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ সম্বন্ধে কোনো তথ্য বা সমীকরণ পাওয়া যায় না। | ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগের সুনির্দিষ্ট সমীকরণ (mvr = nh / 2π) পাওয়া যায়। |
| ৬ | কক্ষপথের ব্যাসার্ধ, ইলেকট্রনের গতিবেগ, মোট শক্তি ও বর্ণালীতে উৎপন্ন রেখার কম্পাঙ্ক নির্ণয় করা যায় না। | বিভিন্ন কক্ষপথের সুনির্দিষ্ট ব্যাসার্ধ, ইলেকট্রনের ঘূর্ণন বেগ, মোট শক্তি ও বর্ণালীর কম্পাঙ্ক গাণিতিকভাবে নিখুঁত নির্ণয় করা যায়। |
| ৭ | ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব অনুসারে পরমাণুর সুস্থিতি ব্যাখ্যা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। | স্থির শক্তিস্তরের ধারণা প্রবর্তন করে পরমাণুর স্থায়ী সুস্থিতি সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। |
