গ্রিনহাউস প্রভাব ও পরিবেশগত প্রভাব
গ্রিনহাউস প্রভাব ও পরিবেশগত প্রভাব
প্রশ্ন: গ্রিনহাউস প্রভাব (Greenhouse effect) কী?
উত্তর: বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে অবস্থিত কিছু গ্যাস কর্তৃক ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত রশ্মি শোষিত ও প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রক্রিয়াকে গ্রিনহাউস প্রভাব বলে।
প্রশ্ন: গ্রিনহাউস গ্যাসের ভূমিকা, উৎস এবং প্রভাব ব্যাখ্যা করো
উত্তর: কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂)
শতকরা পরিমাণ ও বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য: গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৫০%। বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ ৩৫০ ppm এবং প্রতি বছর এর বৃদ্ধির হার ০.৪%।
উৎস: কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও মোটরগাড়ি প্রভৃতিতে ব্যাপক পরিমাণে ফসিল (জীবাশ্ম) জ্বালানি ব্যবহারের ফলে এটি উৎপন্ন হয়। এছাড়া প্রাকৃতিক কারণ যেমন— বনভূমিতে আগুন (দাবানল) এবং আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের সময়ও প্রচুর পরিমাণ CO₂ বায়ুতে যুক্ত হয়।
গুরুত্ব: বায়ুমণ্ডলে CO₂ এর উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। কার্বন ডাইঅক্সাইড ছাড়া উদ্ভিদের পক্ষে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাবার উৎপাদন সম্ভব নয়। উদ্ভিদ এ প্রক্রিয়ায় CO₂ গ্রহণ করে পানির (H₂O) সাথে সূর্যালোক ও ক্লোরোফিলের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে শর্করা ও অক্সিজেন (O₂) উৎপন্ন করে এবং বায়ুতে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়, যা প্রাণীকুল শ্বসন প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। এভাবে বায়ুমণ্ডলে CO₂ এবং O₂ এর ভারসাম্য রক্ষা হয়।
ক্ষতিকর প্রভাব: নানাবিধ কারণে বায়ুমণ্ডলে CO₂ এর আনুপাতিক পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। বনভূমি হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদিত অতিরিক্ত গ্যাস সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারছে না। CO₂ বৃদ্ধির এই হার অব্যাহত থাকলে আগামী এক শতকের মধ্যে এর পরিমাণ বায়ুমণ্ডলে দ্বিগুণ হবে এবং পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩.৮°C বৃদ্ধি পাবে, যা পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
২. মিথেন (CH₄)
শতকরা পরিমাণ ও তথ্য: গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঠিক পরের অবস্থানেই রয়েছে মিথেন, যার অবদান প্রায় ১৯%। বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ ১.৭ ppm এবং প্রতি বছর এটি ১% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উৎস: বিভিন্ন ফসলের জমির উচ্ছিষ্ট অংশের ব্যাকটেরিয়াজনিত পচন এবং গাছপালা ও বিভিন্ন প্রাণীর মলমূত্রের পচনের মাধ্যমে মিথেন উৎপন্ন হয়। তাছাড়া বিভিন্ন জৈব বর্জ্য পদার্থ এবং তেল ও গ্যাসের খনি থেকে প্রতিনিয়ত CH₄ গ্যাস বায়ুতে যুক্ত হচ্ছে।
ক্ষতিকর প্রভাব: বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইডের চেয়ে অনেক কম হলেও এর তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা প্রায় ২৫ গুণ বেশি, যা গ্রিনহাউজ প্রভাব সৃষ্টিতে তীব্র ভূমিকা পালন করে।
৩. সিএফসি (CFC)
শতকরা পরিমাণ ও তথ্য: গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে সিএফসি (ক্লোরোফ্লোরোকার্বন) এর ভূমিকা প্রায় ১৬%। বায়ুমণ্ডলে এই যৌগগুলোর পরিমাণ বছরে গড়ে প্রায় ৩-৪% হারে বাড়ছে।
উৎস: হিমকারক যন্ত্র (যেমন: এসি, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজ প্রভৃতি), ফোম শিল্প, খাদ্য সংরক্ষণ এবং প্রসাধনী ও কীটনাশকের উৎপাদনে সিএফসি ব্যবহার করা হয়।
ক্ষতিকর প্রভাব: বায়ুমণ্ডলে মিশে গিয়ে এটি তীব্র গ্রিনহাউজ প্রভাব সৃষ্টি করছে। সিএফসি-এর তাপ ধারণ ক্ষমতা সাধারণ কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) গ্যাসের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ হাজার গুণ বেশি।
৪. ওজোন (O₃)
শতকরা পরিমাণ ও তথ্য: গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে ওজোন গ্যাসের অবদান প্রায় ৪%। ট্রপোস্ফিয়ারের বহু স্থানে ওজোন গ্যাসের বছরে গড় বৃদ্ধি হার ০.৪-১%।
উৎস: বিভিন্ন মোটরযান, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পে ফসিল জ্বালানির দহনের ফলে প্রচুর পরিমাণ নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড (NOₓ) উৎপন্ন হয়। এই উৎপন্ন NOₓ বায়ুমণ্ডলের হাইড্রোকার্বন ও অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে ট্রপোস্ফিয়ারে ওজোন সৃষ্টি করে।
গুরুত্ব: স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোন গ্যাস সূর্য হতে আগত ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মিকে (UV Ray) শোষণ করে পৃথিবীতে জীবন ধারণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
ক্ষতিকর প্রভাব: স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে উপকারী হলেও, ট্রপোস্ফিয়ারের ওজোন গ্যাস একটি গ্রিনহাউজ গ্যাস হিসেবে কাজ করে। ওজোন গ্যাসের তাপ ধারণ ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা ১০ গুণ বেশি।
৫. নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O)
শতকরা পরিমাণ ও তথ্য: গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে নাইট্রাস অক্সাইডের অবদান প্রায় ৫%। বায়ুমণ্ডলে এই গ্যাসের বছরে গড় বৃদ্ধির পরিমাণ ০.২ – ০.৩%।
উৎস: মোটরগাড়ি, কলকারখানা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যাপক পরিমাণে ফসিল জ্বালানি দহনের সময় প্রচুর N₂O সৃষ্টি হয়ে বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়। এছাড়া বনাঞ্চলে দাবানলের সময়ও প্রচুর পরিমাণে নাইট্রাস অক্সাইড বায়ুতে মিশে যায়।
ক্ষতিকর প্রভাব: এটি বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়ে গ্রিনহাউজ প্রভাবকে ত্বরান্বিত করছে। নাইট্রাস অক্সাইডের তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা সাধারণ কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) গ্যাসের চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি।
গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে অবদান ও ক্ষমতা:
| গ্যাসের নাম | অবদান (%) | আপেক্ষিক উষ্ণকরণ ক্ষমতা | বর্তমান পরিমাণ ও বৃদ্ধির হার |
|---|---|---|---|
| CO₂ (কার্বন ডাইঅক্সাইড) | ৫০% | ১ | ৩৫০ ppm (বৃদ্ধি: ০.৪%) |
| CH₄ (মিথেন) | ১৯% | ২৫ | ১.৭ ppm (বৃদ্ধি: ১%) |
| CFC (ক্লোরোফ্লোরোকার্বন) | ১৬% | ১৫০০০-২০০০ | বৃদ্ধি: ৩-৪% |
| O₃ (ওজোন) | ৪% | ১০ | বৃদ্ধি: ০.৪-১% (ট্রপোস্ফিয়ার) |
| N₂O (নাইট্রাস অক্সাইড) | ৫% | ২০০ | বৃদ্ধি: ০.২-০.৩% |
| H₂O (জলীয় বাষ্প) | – | – | পরিবেশভেদে তারতম্য |
গ্রিনহাউস প্রভাব ও বিস্তারিত তথ্যসমূহ
প্রশ্ন: গ্রিনহাউস প্রভাব (Greenhouse Effect) কী?
উত্তর: সংজ্ঞা (Definition)
সূর্য থেকে আগত ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোক রশ্মি বায়ুমণ্ডলের স্তর ভেদ করে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করার পর, ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত (IR) রশ্মিকে বায়ুমণ্ডলের কিছু নির্দিষ্ট গ্যাস দ্বারা আটকে রেখে পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে গ্রিনহাউস প্রভাব বা Greenhouse Effect বলে। এই প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরটি একটি কাঁচের ঘরের (Greenhouse) মতো আচরণ করে।
প্রশ্ন: গ্রিনহাউস প্রভাবের কার্যপ্রণালী ও প্রক্রিয়া (Mechanism of Greenhouse Effect) ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: গ্রিনহাউস প্রভাবটি মূলত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- সূর্যরশ্মির আগমন: পৃথিবীর তাপ ও শক্তির মূল উৎস হলো সূর্য। সূর্য থেকে আগত ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট রশ্মিগুলো (যেমন: Near-UV, Visible Light বা দৃশ্যমান আলো, Near-IR ইত্যাদি) বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় স্তর ভেদ করে সহজেই ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে। বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহ এই আগত আলোকরশ্মিকে পৃথিবীতে আসতে কোনো বাধা প্রদান করে না।
- ভূপৃষ্ঠের তাপ বিকিরণ: পৃথিবীতে আসা সূর্যালোকের সবটুকু অংশ পৃথিবী শোষণ করে না। ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হওয়ার পর প্রয়োজনাতিরিক্ত শক্তিকে দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট অবলোহিত রশ্মি (Long-wave Infrared Ray) হিসেবে মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে পুনরায় বিকিরণ বা ছেড়ে দেয়।
- তাপমাত্রা আটকে পড়া (শোষণ): ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত এই দীর্ঘ তরঙ্গের অবলোহিত রশ্মির সবটুকু মহাশূন্যে ফিরে যেতে পারে না। বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে থাকা কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), জলীয় বাষ্প (H₂O বাষ্প) এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহ এই বিকিরিত তাপ বা IR রশ্মিকে শোষণ করে নেয়।
- তাপ ধারণ ক্ষমতা ও উষ্ণতা বৃদ্ধি: শোষিত এই তাপ মহাশূন্যে ফিরে না গিয়ে আবহাওয়ামণ্ডলেই আটকে থাকে এবং পুনরায় ভূপৃষ্ঠের দিকেই প্রতিফলিত হয়। ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপ ধারণ ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায় এবং পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।
প্রশ্ন: গ্রীন হাউস প্রভাবের বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: গ্রীন হাউস প্রভাবের ফলে বর্তমান বিশ্বে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। যথা: (ক) প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া (Adverse Reactions) ও (খ) অনুকূল প্রতিক্রিয়া (Favorable Reactions)।
(ক) প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া (Adverse Reactions)
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশগত অবনতি একটি মারাত্মক সমস্যা। মানুষের নিজেদের অবহেলার কারণেই প্রতিদিন চারপাশে বিষাক্ত পরিমণ্ডল তৈরি হচ্ছে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক নিঃশব্দ বিষক্রিয়ার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রীন হাউস প্রভাবের প্রধান প্রতিকূল প্রভাবসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১। ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি: সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর ও সাধারণ আলোকরশ্মিকে পৃথিবীতে আসতে দেয়, কিন্তু ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত দীর্ঘ তরঙ্গের তাপকে মহাশূন্যে ফিরে যেতে বাধা দেয়। বায়ুমণ্ডলে এই গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহের পরিমাণ যত বৃদ্ধি পাবে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির (Global Warming) হারও তত তীব্র হবে।
– অতীতের রেকর্ড: গ্রীন হাউস প্রভাবের ফলে গত ১০০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৩° – ০.৬°C।
– ভবিষ্যতের পূর্বাভাস: তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারা বর্তমান হারে অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৪°C – ৪.৫°C বৃদ্ধি পাবে এবং ২০৫০ সালে এই তাপমাত্রা ৬°C পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
২। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভৌগোলিক বিপর্যয়:
– উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ: তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির তাপীয় সম্প্রসারণ ঘটবে। এর পাশাপাশি হিমবাহ ও মেরু প্রদেশের বরফ গলনের ফলেও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে।
– গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট ও বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি: ওয়ার্ল্ড ওয়াচ ইনস্টিটিউটের রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রীন হাউস প্রভাবের ফলে পৃথিবীর জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে, তাতে পৃথিবীর শতকরা তিন ভাগ এলাকা হুমকির সম্মুখীন হবে, যার মধ্যে থাকবে মূল্যবান কৃষি জমি। এছাড়া প্রায় এক বিলিয়ন লোক গৃহহীন হয়ে পড়বে। ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্স (যুক্তরাষ্ট্র)-এর মতে, ২০৮৭ সাল নাগাদ সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ৫০–১০০ সে.মি. বৃদ্ধি পেতে পারে।
– অঞ্চলভিত্তিক সুনির্দিষ্ট প্রভাব: আমেরিকা (মায়ামী ও ফ্লোরিডার ১৯০০ কি.মি. উপকূল), ইউরোপ ও এশিয়া (সিউল, বেইজিং, লন্ডন, নেদারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের উপকূল), উপমহাদেশ ও নিম্নাঞ্চল (মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, ভারতের মাদ্রাস, গোয়া, নৈনিতাল, গঙ্গা অববাহিকা ও বাংলাদেশের অংশ) তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৩। আবহাওয়ার পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: উত্তর-পূর্ব চীন শুষ্ক হয়ে যাবে। অপরদিকে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোচীন, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়া আরও বর্ষাসিক্ত (বৃষ্টিপ্রবণ) হয়ে উঠবে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হয়েছে। ১৯৮৮ সালে আমেরিকার খরা ও বাংলাদেশের ভয়াবহ বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুনরায় দেখা দিতে পারে। ঘূর্ণিঝড় আরও অধিক শক্তিতে আঘাত হানবে।
৪। পানির চক্রের উপর প্রভাব: ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানির তাপীয় সম্প্রসারণ ও বরফ গলন ত্বরান্বিত হবে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বর্তমান উচ্চতার তুলনায় ৩০–৪০ সে.মি. বৃদ্ধি পাবে। তীব্র তাপমাত্রার কারণে এলাকাগুলো মরু অঞ্চলে পরিণত হবে।
৫। ইকোসিস্টেম (বাস্তুতন্ত্র)-এর উপর প্রভাব: ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সমুদ্রের জৈব উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাবে। ফলে গভীর সমুদ্র এবং সমতলের মধ্যে পুষ্টিকর পদার্থের আদান-প্রদান কমে যাবে, যা খাদ্য চক্রকে বিনষ্ট করবে। আবহাওয়ামণ্ডলের পরিবর্তনের ফলে স্বল্প দৈর্ঘ্য আর্দ্র শীতকাল এবং দীর্ঘ উষ্ণ গ্রীষ্মকাল দেখা যাবে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে, বনাঞ্চল ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং মানুষ তাদের আবাসস্থল হারাবে।
৬। মানব স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব: অতিরিক্ত তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে মানুষের ত্বকের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়াসহ নানা রকমের রোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৭। বনাঞ্চল ও খাদ্য উৎপাদনের উপর প্রভাব: তাপমাত্রা বৃদ্ধি খাদ্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ হবে। রাশিয়া, কানাডা ইত্যাদি দেশসমূহ মরু অঞ্চলে পরিণত হবে এবং ভূমির উর্বরতা যথেষ্ট হ্রাস পাবে। তীব্র দাবানলের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন বনাঞ্চল ধ্বংস হবে এবং মরুভূমিতে পরিণত হবে।
(খ) গ্রীন হাউস প্রভাবের অনুকূল প্রতিক্রিয়া (Favorable Reactions)
গ্রীন হাউস প্রভাব পৃথিবীর সামগ্রিক ক্ষতি করলেও কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দেশের জন্য কিছু সুফল বা অনুকূল পরিবেশও বয়ে আনবে। যেমন:
- শুষ্ক অঞ্চলে বৃষ্টিপাত: চীন, ভারত, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের শুষ্কতম এলাকাগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
- চাষাবাদ ও বসবাসের উপযোগিতা: মেরু ও শীতল অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করার ফলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাইবেরিয়া এবং কানাডার উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ একর মরু বা বরফাচ্ছাদিত এলাকা বরফমুক্ত হবে। ফলে এই বিশাল অঞ্চলগুলো নতুন করে চাষাবাদ এবং মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠবে।
ক. জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ১)
১. গ্রিনহাউস প্রভাব (Greenhouse effect) কী?
উত্তর: বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে অবস্থিত কিছু গ্যাস কর্তৃক ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত রশ্মি শোষিত ও প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রক্রিয়াকে গ্রিনহাউস প্রভাব বলে।
২. পৃথিবীর তাপ ও শক্তির মূল উৎস কী?
উত্তর: পৃথিবীর তাপ ও শক্তির মূল উৎস হলো সূর্যের আলো।
৩. সূর্য থেকে কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ক্ষতিকর রশ্মি বায়ুমণ্ডলে আসে?
উত্তর: সূর্য থেকে ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি (যেমন: Near-UV, Visible light, Near-IR ইত্যাদি) বায়ুমণ্ডলে আসে।
৪. ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ কোন প্রকৃতির রশ্মি?
উত্তর: ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ হলো দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট অবলোহিত (Infrared/IR) রশ্মি।
৫. ওজোন গ্যাস (O₃) বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে থাকলে তা উপকারী?
উত্তর: ওজোন গ্যাস বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকলে তা সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে পৃথিবীতে জীবন ধারণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৬. ট্রপোস্ফিয়ারে ওজোন গ্যাস কী হিসেবে কাজ করে?
উত্তর: ট্রপোস্ফিয়ারে ওজোন গ্যাস একটি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে কাজ করে।
৭. মিথেনের (CH₄) তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা কত গুণ বেশি?
উত্তর: মিথেন গ্যাসের তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা প্রায় ২৫ গুণ বেশি।
৮. সিএফসি (CFC)-এর তাপ ধারণ ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা কত গুণ বেশি?
উত্তর: সিএফসি-এর তাপ ধারণ ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা ১৫–২০ হাজার গুণ বেশি।
৯. নাইট্রাস অক্সাইডের (N₂O) তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা CO₂-এর চেয়ে কত গুণ বেশি?
উত্তর: নাইট্রাস অক্সাইডের তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা CO₂-এর চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি।
১০. ওজোন গ্যাসের (O₃) তাপ ধারণ ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা কত গুণ বেশি?
উত্তর: ওজোন গ্যাসের তাপ ধারণ ক্ষমতা CO₂ অপেক্ষা ১০ গুণ বেশি।
১১. গত ১০০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা কত বৃদ্ধি পেয়েছে?
উত্তর: গ্রিনহাউস প্রভাবের ফলে গত ১০০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৩° – ০.৬°C।
১২. ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা কত ডিগ্রি বৃদ্ধি পেতে পারে?
উত্তর: ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৪°C – ৪.৫°C পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
১৩. ২০৫০ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা কত ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে?
উত্তর: ২০৫০ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৬°C পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৪. কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির বার্ষিক হার কত?
উত্তর: বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির বার্ষিক হার ০.৪%।
১৫. বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাস প্রতি বছর কী হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?
উত্তর: বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের পরিমাণ বছরে ১% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৬. বায়ুমণ্ডলে সিএফসি (CFC) যৌগগুলোর পরিমাণ বছরে গড়ে কী হারে বাড়ছে?
উত্তর: বায়ুমণ্ডলে সিএফসি যৌগগুলোর পরিমাণ বছরে গড়ে প্রায় ৩-৪% হারে বাড়ছে।
১৭. ট্রপোস্ফিয়ারে ওজোন গ্যাসের বার্ষিক গড় বৃদ্ধি হার কত?
উত্তর: ট্রপোস্ফিয়ারের বহুস্থানে ওজোন গ্যাসের বছরে গড় বৃদ্ধি হার ০.৪–১%।
১৮. বায়ুমণ্ডলে নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) গ্যাসের বছরে গড় বৃদ্ধির পরিমাণ কত?
উত্তর: বায়ুমণ্ডলে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাসের বছরে গড় বৃদ্ধির পরিমাণ ০.২ – ০.৩%।
১৯. কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মতে এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের ওপর গ্রিনহাউসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে?
উত্তর: অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক এরিক বার্ড-এর মতে।
২০. সমুদ্রের পানি ৬ ফুট বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের কোন অঞ্চল সাগরে পরিণত হবে?
উত্তর: সমুদ্রের পানি ৬ ফুট বৃদ্ধি পেলে ফরিদপুরের ঢালু অংশ সাগরে পরিণত হবে।
২১. গ্রিনহাউস প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের কত শতাংশ ভূমি জলমগ্ন হতে পারে?
উত্তর: বাংলাদেশের প্রায় ১৫ শতাংশ ভূমি (বা ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার) জলমগ্ন হতে পারে।
২২. গ্রিনহাউস প্রভাবের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের কতটি জেলার কতটি থানা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
উত্তর: বাংলাদেশের ১৩টি জেলার ৬২টি থানা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২৩. বাংলাদেশে জলোচ্ছ্বাসের গড় স্থিতিকাল কত সময়?
উত্তর: বাংলাদেশে জলোচ্ছ্বাসের গড় স্থিতিকাল ১–১০ ঘণ্টা।
২৪. বাংলাদেশে বন্যার গড় স্থিতিকাল কত দিন?
উত্তর: বাংলাদেশে বন্যার গড় স্থিতিকাল ৭–৮০ দিন।
২৫. বাংলাদেশে খরার গড় স্থিতিকাল কত দিন?
উত্তর: বাংলাদেশে খরার গড় স্থিতিকাল ১৫–১০০ দিন।
২৬. পরিবেশবিদদের মতে অটোরিকশা ও অটোটেম্পো অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় কত গুণ বেশি পরিবেশ দূষণ করে?
উত্তর: অটোরিকশা ও অটোটেম্পো অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় ২৩ গুণ বেশি পরিবেশ দূষণ করে।
