ইলেকট্রন বিন্যাস কী এবং আউফবাউ নীতি ব্যাখ্যা
পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস (Electronic Configuration of Atoms):
পরমাণুর ইলেকট্রন সংখ্যা একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা, যার গঠন দ্বারা পরমাণুর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়ম মেনে কোনো পরমাণুর নির্দিষ্ট সংখ্যক ইলেকট্রন ঐ পরমাণুর বিভিন্ন নির্দিষ্ট শক্তিস্তর ও উপশক্তিস্তরের বিভিন্ন অরবিটালে সজ্জিত থাকে। পরমাণুর বিভিন্ন অরবিটালে ইলেকট্রনের এই সজ্জাকে ইলেকট্রন বিন্যাস বলে।
পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস কতগুলো সাধারণ নিয়ম মেনে চলে। সেই নিয়মগুলো হলো:
- (ক) পলির বর্জন নীতি (Pauli’s Exclusion Principle)
- (খ) আউফবাউ নীতি (Aufbau Principle)
- (গ) হুন্ডের নীতি (Hund’s Rule)
আউফবাউ নীতি (Aufbau Principle):
মৌলের পরমাণুতে ইলেকট্রন বণ্টনের ক্ষেত্রে কোন শক্তিস্তরের কোন্ অরবিটালে ইলেকট্রন আগে প্রবেশ করবে, তা যে নিয়ম অনুসারে হয়ে থাকে ঐ নিয়মটিকে বলা হয় আউফবাউ (Aufbau) নীতি।
এই নিয়ম অনুসারে মৌলের পরমাণুতে শক্তির উচ্চক্রম অনুসারে অরবিটালগুলোতে ইলেকট্রন প্রবেশ করে। অর্থাৎ নিম্নশক্তির অরবিটালে ইলেকট্রন আগে প্রবেশ করবে। এই নিয়ম অনুসারে প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা (n) ও সহকারী কোয়ান্টাম সংখ্যার (l) সম্মিলিত মান অর্থাৎ (n + l) দ্বারা অরবিটালের শক্তি নির্ণীত হয়।
উদাহরণ ১: 3d এবং 4s এর মধ্যে কোনটিতে ইলেকট্রন আগে প্রবেশ করবে?
- 3d অরবিটাল: এখানে, n = 3, l = 2 —> n + l = 3 + 2 = 5
- 4s অরбиটাল: এখানে, n = 4, l = 0 —> n + l = 4 + 0 = 4
সিদ্ধান্ত: যেহেতু 4s এর ক্ষেত্রে (n + l) এর মান ছোট, তাই এই অরবিটালের শক্তি কম এবং ইলেকট্রন 4s অরবিটালে আগে প্রবেশ করবে।
উদাহরণ ২: 4p এবং 5s এর মধ্যে কোনটিতে ইলেকট্রন আগে প্রবেশ করবে?
- 4p অরবিটাল: এখানে, n = 4, l = 1 —> n + l = 4 + 1 = 5
- 5s অরбиটাল: এখানে, n = 5, l = 0 —> n + l = 5 + 0 = 5
সিদ্ধান্ত: যেহেতু 4p এবং 5s উভয়ের ক্ষেত্রে (n + l) এর মান সমান (অর্থাৎ ৫), তাই যে অরবিটালের প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা n এর মান ছোট, সেই অরবিটালের শক্তি কম হবে। এখানে 4p এর n এর মান (৪) ছোট, এজন্য 4p অরবিটালে ইলেকট্রন আগে প্রবেশ করবে এবং পূর্ণ হবে।
আউফবাউ নীতি অনুসারে অরবিটালসমূহের শক্তির উচ্চক্রম:
ইলেকট্রন বিন্যাসের সাধারণ নিয়ম ও (n + l) নিয়মের ব্যতিক্রম
সাধারণ নিয়মে কোনো মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাসের শেষ উপস্তরে যদি d4, d9, f6, f13 আসে, তবে সেটি পরমাণুর প্রকৃত বা সঠিক ইলেকট্রন বিন্যাস হয় না। এক্ষেত্রে অধিক সুস্থিতি অর্জনের জন্য নিকটবর্তী s অরবিটাল হতে একটি ইলেকট্রন স্থানান্তরিত হয়ে যথাক্রমে d5, d10, f7, f14 পূর্ণ বা অর্ধপূর্ণ কাঠামো গঠন করে।
• Cr(24) → 1s2 2s2 2p6 3s2 3p6 3d4 4s2 (সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী – ভুল)
• Cr(24) → 1s2 2s2 2p6 3s2 3p6 3d5 4s1 (প্রকৃত ও সঠিক বিন্যাস)
• Cu(29) → 1s2 2s2 2p6 3s2 3p6 3d9 4s2 (সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী – ভুল)
• Cu(29) → 1s2 2s2 2p6 3s2 3p6 3d10 4s1 (প্রকৃত ও সঠিক বিন্যাস)
ব্যতিক্রমের কারণ: সমশক্তিসম্পন্ন অর্ধপূর্ণ (Half-filled) বা সম্পূর্ণ পূর্ণ (Fully-filled) d এবং f অরবিটালগুলোর প্রতিসাম্যতা এবং স্থায়িত্ব অনেক বেশি থাকে। তাই পরমাণু তার নিজের স্থায়িত্ব বা স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই ব্যতিক্রমী বিন্যাস প্রদর্শন করে।
ল্যান্থানাম (57La) ও অ্যাকটিনিয়াম (89Ac) এর ইলেকট্রন বিন্যাসের ক্ষেত্রে আউফবাউ নীতি বা (n + l) নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে।
• 5f ও 6d উপকক্ষের ক্ষেত্রে: (n + l) এর মান যথাক্রমে (5 + 3 = 8) এবং (6 + 2 = 8) অর্থাৎ সমান।
নিয়মানুযায়ী যখন (n + l) এর মান সমান হয়, তখন কম প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা (n) যুক্ত অরবিটালের শক্তিমাত্রা কম হয়। সেই হিসাবে শক্তির ক্রম হওয়া উচিত: 4f < 5d এবং 5f < 6d।
কাজেই আউফবাউ বা (n + l) নিয়ম অনুযায়ী ল্যান্থানাম ও অ্যাকটিনিয়ামের ইলেকট্রন বিন্যাস হওয়া উচিত ছিল:
• La(57) → [Xe] 4f1 5d0 6s2
• Ac(89) → [Rn] 5f1 6d0 7s2
• La(57) → [Xe] 4f0 5d1 6s2
• Ac(89) → [Rn] 5f0 6d1 7s2
অর্থাৎ, ল্যান্থানাম ও অ্যাকটিনিয়ামের ক্ষেত্রে ইলেকট্রন কম শক্তির f অরবিটালে না গিয়ে সরাসরি d অরবিটালে প্রবেশ করে। এভাবেই এদের ক্ষেত্রে (n + l) নিয়মের ব্যতিক্রমটি ঘটে।
আউফবাউ নীতি (Aufbau Principle) — প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: আউফবাউ (Aufbau) নীতিটি লেখো।
উত্তর: পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস করার সময় ইলেকট্রনসমূহ প্রথমে সর্বনিম্ন শক্তির অরবিটালে প্রবেশ করে এবং এই সর্বনিম্ন শক্তির অরবিটাল পূর্ণ করার পর ক্রমান্বয়ে উচ্চ শক্তির অরবিটালে স্থান গ্রহণ করে।
প্রশ্ন ২: ‘Aufbau’ শব্দটি কোন ভাষা থেকে এসেছে এবং এর অর্থ কী?
উত্তর: ‘Aufbau’ একটি জার্মান শব্দ, যার অর্থ হলো— “building up” বা “ক্রমান্বয়ে গড়ে তোলা”।
প্রশ্ন ৩: অরবিটালের শক্তি পরিমাপের নিয়ম বা নীতিটি কী?
উত্তর: অরবিটালের শক্তি নির্ধারিত হয় প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা (n) এবং সহকারী কোয়ান্টাম সংখ্যা (l) এর সমষ্টি বা (n + l) এর মান দ্বারা।
প্রশ্ন ৪: কোন অরবিটাল কাঠামো সবচেয়ে বেশি সুস্থিত বা স্থিতিশীল হয়?
উত্তর: সমশক্তিসম্পন্ন অরবিটালসমূহ সম্পূর্ণ পূর্ণ (যেমন: d10, f14) বা অর্ধপূর্ণ (যেমন: d5, f7) অবস্থায় থাকলে সেই ইলেকট্রন বিন্যাস সবচেয়ে বেশি সুস্থিত হয়।
প্রশ্ন ১: পটাশিয়ামের (19K) ১৯তম ইলেকট্রনটি 3d অরবিটালে না গিয়ে 4s অরবিটালে যায় কেন?
• 4s অরবিটালের জন্য: n = 4, l = 0 → (n + l) = 4 + 0 = 4
প্রশ্ন ২: 3d এবং 4p অরবিটালের মধ্যে কোনটিতে ইলেকট্রন আগে প্রবেশ করবে এবং কেন?
• 4p অরবিটালের ক্ষেত্রে: (n + l) = 4 + 1 = 5
প্রশ্ন ৩: ক্রোমিয়ামের (24Cr) ইলেকট্রন বিন্যাস আউফবাউ নিয়মের ব্যতিক্রম হয় কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আউফবাউ নীতি অনুযায়ী ক্রোমিয়ামের স্বাভাবিক ইলেকট্রন বিন্যাস [Ar] 3d4 4s2 হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা জানি, সমশক্তিসম্পন্ন অরবিটালসমূহ (যেমন- d অরবিটাল) অর্ধপূর্ণ (d5) বা সম্পূর্ণ পূর্ণ (d10) অবস্থায় থাকলে পরমাণুর কাঠামোটি ইলেকট্রনিক প্রতিসাম্যতার কারণে সবচেয়ে বেশি সুস্থিত বা স্থিতিশীল হয়।
ক্রোমিয়ামের ক্ষেত্রে 4s অরবিটাল থেকে একটি ইলেকট্রন সহজেই 3d অরবিটালে চলে যায়, যার ফলে প্রকৃত বিন্যাসটি হয় [Ar] 3d5 4s1। এখানে d ও s দুটি অরবিটালই অর্ধপূর্ণ হওয়ায় পরমাণুটি সর্বোচ্চ স্থিতিশীলতা লাভ করে। এই বিশেষ সুস্থিতির কারণেই ক্রোমিয়ামের ইলেকট্রন বিন্যাস আউফবাউ নিয়মের ব্যতিক্রম দেখায়।
প্রশ্ন ৪: ল্যান্থানামের (57La) ইলেকট্রন বিন্যাসে আউফবাউ বা (n + l) নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে কেন?
• 5d অরবিটালের জন্য: (n + l) = 5 + 2 = 7
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, 5d এবং 4f অরবিটালের শক্তির পার্থক্য অত্যন্ত কম এবং ল্যান্থানামের ক্ষেত্রে 5d অরবিটালটি সাময়িকভাবে বেশি সুস্থিতি পায়। ফলে ইলেকট্রন 4f অরবিটালকে সম্পূর্ণ খালি বা বর্জন করে সরাসরি 5d অরবিটালে প্রবেশ করে প্রকৃত বিন্যাস গঠন করে: [Xe] 4f0 5d1 6s2। এই কারণেই ল্যান্থানামের ক্ষেত্রে আউফবাউ বা (n + l) নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে।
