পানির খরতা এবং পানির pH
সারফেস ওয়াটারের বিশুদ্ধতার মানদণ্ড (Purity Criteria of Surface Water)
শিল্পকারখানা ও কৃষিকাজে সারফেস ওয়াটার বা ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের পূর্বে এর বিশুদ্ধতার মানদণ্ডরূপে পানির pH, খরতা (Hardness), DO (দ্রবীভূত অক্সিজেন), BOD, COD এবং TDS জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে পানির এই গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
খরপানি (Hard Water)
মিঠা পানিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে দ্বি-ধনাত্মক ক্যাটায়ন যেমন—ক্যালসিয়াম (Ca2+), ম্যাগনেসিয়াম (Mg2+) ও আয়রন (Fe2+) আয়ন দ্রবীভূত থাকলে, সেই পানিকে খরপানি (Hard Water) বলা হয়। এই খরপানির ক্যাটায়নগুলো সাবানের জৈব অ্যানায়নের (স্টিয়ারেট আয়ন) সাথে বিক্রিয়া করে পানিতে অদ্রবণীয় আঠালো ভাসমান পদার্থ বা সাবানের অপচয় ঘটায় (Soap Scum) তৈরি করে। এতে সাবানের ফেনা না হয়ে প্রচুর অপচয় ঘটে।
পানির খরতা (Hardness of Water)
পানিতে অধিক পরিমাণে দ্বি-ধনাত্মক ক্যাটায়ন বিশেষ করে Ca2+, Mg2+ ও Fe2+ আয়নের উপস্থিতির কারণে সাবানের সাথে সহজে ফেনা উৎপন্ন না করার যে বিশেষ ধর্ম দেখা যায়, তাকে পানির খরতা বলে। পানির এই খরতা মূলত দুই প্রকার:
- ক) স্থায়ী খরতা (Permanent Hardness)
- খ) অস্থায়ী খরতা (Temporary Hardness)
ক) স্থায়ী খরতা
পানিতে Ca2+, Mg2+ ও Fe2+ আয়নের ক্লোরাইড (Cl–) ও সালফেট (SO42-) লবণ অধিক পরিমাণে দ্রবীভূত থাকলে পানিতে স্থায়ী খরতা সৃষ্টি হয়। এই পানিকে শুধুমাত্র ফুটিয়ে স্থায়ী খরতা দূর করা যায় না। এর জন্য রাসায়নিক পদ্ধতি বা আয়ন এক্সচেঞ্জ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।
স্থায়ী খরতা দূরীকরণ পদ্ধতি:
(i) কাপড় কাচা সোডা পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে খরপানিতে কাপড় কাচা সোডা বা সোডিয়াম কার্বনেট (Na2CO3 · 10H2O) যোগ করা হয়। ফলে পানিতে উপস্থিত দ্রবণীয় Ca2+ এবং Mg2+ আয়ন অদ্রবণীয় কার্বনেট লবণ হিসেবে অধঃক্ষিপ্ত হয় এবং পানি মৃদু হয়।
খ) অস্থায়ী খরতা
পানিতে Ca2+, Mg2+ ও Fe2+ আয়নের বাইকার্বনেট (HCO3–) লবণ দ্রবীভূত থাকার কারণে যে খরতা সৃষ্টি হয়, তাকে অস্থায়ী খরতা বলে। অস্থায়ী খরতার পানিকে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে বাইকার্বনেট লবণ তাপে বিয়োজিত হয়ে অদ্রবণীয় কার্বনেটরূপে নিচে অধঃক্ষিপ্ত হয় এবং পানি মৃদু পানিতে পরিণত হয়।
অস্থায়ী খরতা দূরীকরণ পদ্ধতি:
(i) স্ফুটন পদ্ধতি (Boiling Method): অস্থায়ী খর পানিকে উত্তপ্ত বা ফোটালে পানিতে দ্রবণীয় ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের বাইকার্বনেট লবণগুলো তাপে ভেঙে অদ্রবণীয় কার্বনেট লবণে পরিণত হয়ে নিচে জমা হয়:
*বিশেষ দ্রষ্টব্য: ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেট (MgCO3) পানিতে সামান্য দ্রবণীয় হওয়ায় শুধুমাত্র ফুটানোর মাধ্যমে ম্যাগনেসিয়াম বাইকার্বনেট ঘটিত অস্থায়ী খরতা সম্পূর্ণরূপে দূর করা যায় না।
(ii) ক্লার্ক পদ্ধতি (Clark’s Method): এই পদ্ধতিতে অস্থায়ী খর পানিতে হিসাবকৃত বা পরিমিত পরিমাণে কলিচুন বা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [Ca(OH)2] মিশিয়ে ভালোভাবে আলোড়িত করা হয়। এতে দ্রবণীয় বাইকার্বনেট লবণগুলো অদ্রবণীয় কার্বনেটে পরিণত হয়ে নিচে থিতিয়ে পড়ে:
যেহেতু উৎপন্ন MgCO3 পানিতে কিছুটা দ্রবণীয়, তাই এটি পুনরায় অতিরিক্ত Ca(OH)2 এর সাথে বিক্রিয়া করে সম্পূর্ণ অদ্রবণীয় ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [Mg(OH)2] রূপে অধঃক্ষিপ্ত হয়:
কলিচুনের পরিমাণ প্রয়োজনের চেয়ে কম হলে ম্যাগনেসিয়াম ঘটিত খরতা পুরোপুরি দূর হয় না, কারণ ১ মোল Mg(HCO3)2 এর জন্য ২ মোল Ca(OH)2 প্রয়োজন হয়। আবার কলিচুনের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে অতিরিক্ত Ca2+ আয়নের কারণে পানিতে কৃত্রিম খরতার সৃষ্টি হয়। তাই ক্লার্ক পদ্ধতিতে একদম সঠিক পরিমাণে কলিচুন ব্যবহার করা আবশ্যক।
স্থায়ী ও অস্থায়ী খরতা একসাথে দূরীকরণ
শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সারফেস ওয়াটারের স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় প্রকার খরতা একসাথে দূর করতে পারমুটিট পদ্ধতি বা আয়ন এক্সচেঞ্জ (Ion Exchange) পদ্ধতি ব্যবহার করে দ্বিযোজী ক্যাটায়নগুলো দূর করা হয়। এই পদ্ধতিতে খর পানিকে সোডিয়াম সালফোনাট গ্রুপযুক্ত রেজিন (R-SO3–Na+) এর মধ্য দিয়ে চালনা করা হয়, যা ক্ষতিকারক ক্যাটায়নগুলোকে সোডিয়াম আয়ন দ্বারা প্রতিস্থাপন করে:
পরবর্তীতে কার্যক্ষমতা হারানো নিষ্ক্রিয় আয়ন-বিনিময় রেজিনকে গাঢ় ব্রাইন বা সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) দ্রবণ দ্বারা পুনরায় ধুয়ে সক্রিয় ও পুনরুজ্জীবিত করা যায়।
খর পানির সুবিধাসমূহ
- শারীরিক গঠন: শক্ত হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম লবণের প্রয়োজন বিধায় খর পানি শিশুদের দেহ গঠনে বিশেষ সহায়ক।
- সিসার বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা: মৃদু পানির তুলনায় খর পানিতে সিসা (Lead) খুব কম দ্রবীভূত হয়। তাই সিসার তৈরি নলের ভেতর দিয়ে খর পানি সরবরাহ করা নিরাপদ এবং এতে বিষক্রিয়ার ভয় থাকে না।
- ওষুধী গুণ: খর পানিতে থাকা বিভিন্ন খনিজ উপাদান চর্মরোগ, বাতরোগ এবং বদহজমের প্রাকৃতিক প্রতিষেধক বা ওষুধ হিসেবে কাজ করে।
খর পানির অসুবিধাসমূহ
- সাবানের অপচয়: কাপড় ধোয়া বা লন্ড্রির কাজে খর পানি ব্যবহার করলে সাবানের ফেনা না হয়ে আঠালো স্তর তৈরি হয়, ফলে সাবান অপচয় হয়।
- বয়লারে আস্তরণ (Scale): ইন্ডাস্ট্রিয়াল বয়লারে খর পানি ব্যবহার করলে এর ভেতরে কঠিন ধাতব লবণের কুপরিবাহী আস্তরণ বা স্কেল পড়ে। ফলে জ্বালানির খরচ বহুগুণ বেড়ে যায় এবং বয়লার বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকে।
- শিল্পকারখানায় ক্ষতি: কাগজ, কৃত্রিম সিল্ক ও রঞ্জন শিল্পে খর পানি ব্যবহার করা যায় না। পানিতে ফেরাস (Fe2+) লবণ থাকলে কাগজ ও সিল্কে বাদামি দাগ পড়ে এবং কাপড়ের রঙ নষ্ট হয়।
- রান্নায় সমস্যা: খর পানিতে চাল, ডাল সহজে সিদ্ধ হতে চায় না, তরকারির স্বাভাবিক স্বাদ ও রঙ নষ্ট হয় এবং বাসনপত্রে বাদামি ছোপ ছোপ দাগ পড়ে।
পানির pH
পানিতে উপস্থিত হাইড্রোজেন আয়নের (H+) মোলার ঘনমাত্রার ঋণাত্মক ১০ ভিত্তিক (base-10) লগারিদমকে পানির pH বলা হয়। গাণিতিকভাবে:
আমরা জানি বিশুদ্ধ পানির pH-এর মান ৭.০ (নিরপেক্ষ)। কিন্তু প্রাকৃতিক সারফেস ওয়াটারে বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্রবীভূত হয়ে মৃদু কার্বনিক এসিড (H2CO3) তৈরি করে। এই কারণে ভূ-पृষ্ঠের পানির স্বাভাবিক pH সাধারণত ৬.০ থেকে ৬.৫ (সামান্য অম্লীয়) হয়ে থাকে।
অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২৫°C তাপমাত্রায় পানের যোগ্য পানির আদর্শ pH সীমা ৬.৫ – ৮.৫ এর মধ্যে হতে হবে (এই সীমায় পানি বর্ণহীন ও গন্ধহীন থাকে)। তবে জলজ প্রাণীদের বেঁচে থাকার এবং মাছ চাষের জন্য পানির সবচেয়ে অনুকূল pH হলো ৭.০ – ৭.৫।
