পানির DO এবং DO নির্ণয়ের মূলনীতি ও পদ্ধতির বিশ্লেষণ
পানির DO (Dissolved Oxygen – দ্রবীভূত অক্সিজেন)
কোনো পানির নমুনায় নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় অক্সিজেন সম্পৃক্ত অবস্থায় যে পরিমাণ অক্সিজেন গ্যাস দ্রবীভূত থাকে, তাকে ওই পানির DO (Dissolved Oxygen) বলা হয়।
১৫°C তাপমাত্রায় অক্সিজেন সম্পৃক্ত পানিতে DO এর মান হয় 10 mg/L বা 10 ppm (ppm = parts per million)। আবার, ২০°C তাপমাত্রায় পানিতে DO এর মান কমে 9.2 ppm হয় (যেহেতু তাপমাত্রা বাড়লে গ্যাসের দ্রাব্যতা হ্রাস পায়)।
পানির DO এর মান নির্ণয়
অক্সিজেন সেন্সর (Sensor) যুক্ত বিশেষ Probe বা ইলেকট্রোডকে সরাসরি পানিতে ডুবিয়ে ডিজিটাল মিটারের সাহায্যে DO এর মান তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়। এছাড়া পরীক্ষাগারে রাসায়নিকভাবে উইঙ্কলার (Winkler) আয়োডোমিতিক পদ্ধতিতে পানির DO নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা হয়। পরিবেশগত মানদণ্ড অনুযায়ী, সারফেস ওয়াটারে DO এর মান অন্তত 5 mg/L (বা 5 ppm) বা এর উপরে থাকা আবশ্যক। তবে নদীর মোহনায় স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে সাধারণত DO এর মান 6 mg/L এর চেয়ে বেশি থাকে।
DO নির্ণয়ের মূলনীতি ও পদ্ধতি
দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ পরিমাপের মাধ্যমেই মূলত পানির বিশুদ্ধতা ও গুণগত মান সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। বর্জ্য পানির দূষণমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত BOD (Biochemical Oxygen Demand – জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা) পরিমাপের মূল ভিত্তিই হলো এই দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO)। প্রাকৃতিক জলাশয়, পয়ঃনিষ্কাশন নর্দমা এবং শিল্পজাত তরল বর্জ্যের বায়বীয় (Aerobic) পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য DO পরিমাপ করা অপরিহার্য। সংশোধিত উইঙ্কলার পদ্ধতিতে আয়োডোমিতির মাধ্যমে মুক্ত আয়োডিনকে টাইট্রেশন করে DO পরিমাপ করা হয়।
ধাপসমূহ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়া (Winkler Method):
-
ক্ষারকীয় পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড (KOH) ও পটাশিয়াম আয়োডাইড (KI) যুক্ত পানির নমুনায় ম্যাঙ্গানিজ সালফেট (MnSO4) যোগ করা হয়। এতে ম্যাঙ্গানিজ হাইড্রোক্সাইড [Mn(OH)2] এর সাদা অধঃক্ষেপ উৎপন্ন হয়:
MnSO4 + 2KOH → Mn(OH)2↓ + K2SO4
-
পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন দ্বারা Mn(OH)2 জারিত হয়ে ক্ষারকীয় ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড বা ম্যাঙ্গানিজ (IV) অক্সাইড হাইড্রেটের বাদামি অধঃক্ষেপ উৎপন্ন করে:
2Mn(OH)2 + O2 (দ্রবীভূত) → 2MnO(OH)2↓ [বাদামি অধঃক্ষেপ]
-
এই মিশ্রণে গাঢ় সালফিউরিক এসিড (H2SO4) যোগ করলে বাদামি অধঃক্ষেপটি দ্রবীভূত হয়ে ম্যাঙ্গানিজ (IV) সালফেটে পরিণত হয়:
MnO(OH)2 + 2H2SO4 → Mn(SO4)2 + 3H2O
-
উৎপন্ন Mn(SO4)2 দ্রবণে উপস্থিত পটাশিয়াম আয়োডাইড (KI) থেকে সমতুল্য পরিমাণে আয়োডিন (I2) বিমুক্ত করে:
Mn(SO4)2 + 2KI → MnSO4 + K2SO4 + I2
-
সবশেষে, স্টার্চ নির্দেশক (Indicator) ব্যবহার করে এই বিমুক্ত মুক্ত আয়োডিনকে প্রমাণ সোডিয়াম থায়োসালফেট (Na2S2O3) দ্রবণ দ্বারা টাইট্রেশন করা হয়:
2Na2S2O3 + I2 → Na2S4·O6 (সোডিয়াম টেট্রাথায়োনেট) + 2NaI
*প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, এই বিক্রিয়ায় বিমুক্ত মুক্ত আয়োডিনের পরিমাণ নমুনায় বিদ্যমান দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণের সরাসরি সমতুল্য।
DO গণনা (Stoichiometric Relationship)
উপরিউক্ত সমীকরণগুলোর ধারাবাহিকতা ও সমতাকরণ অনুসারে পাই:
অতএব, সম্পর্কটি দাঁড়ায়:
বা, 1 mol Na2S2O3 ≡ 0.25 mol O2 (দ্রবীভূত DO)
পানির DO এর গুরুত্ব ও প্রভাব
(১) জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষা: নদী, পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে অতিরিক্ত জৈব বর্জ্য বা আবর্জনা পচনের ফলে ব্যাকটেরিয়ার ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি পায়, যা পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) দ্রুত কমিয়ে দেয়। DO কমে গেলে পানির বায়ুজীবী (Aerobic) জলজ প্রাণী, বিশেষ করে মাছ অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়। পক্ষান্তরে, অবায়ুজীবী (Anaerobic) জলজ উদ্ভিদ ও ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ওই পানিতে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত হয়ে মাছ মরে ভেসে ওঠে।
(২) দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি: পানিতে DO এর মান কমে গেলে পচনশীল জৈব বস্তুর সম্পূর্ণ জারণ ঘটে না, বরং অসম্পূর্ণ জারণ বা পচন ঘটে। এর ফলে পানিতে অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত ও বিষাক্ত গ্যাস যেমন—মিথেন (CH4), হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S), ফসফিন (PH3) এবং বিভিন্ন অ্যামিন জাতীয় ক্ষতিকর যৌগ উৎপন্ন হয়, যা পরিবেশ দূষিত করে। মূলত শহরের পয়ঃবর্জ্য, মলমূত্র এবং শিল্পকারখানার তরল পচনশীল বর্জ্যই পানির DO হ্রাসের জন্য প্রধানত দায়ী।
চূড়ান্ত নিট ফল: সারফেস ওয়াটারের DO এর মান 5 ppm (বা 5 mg/L) এর নিচে নেমে গেলে বায়ুজীবী জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে অবায়ুজীবী উদ্ভিদ ও ক্ষতিকর অণুজীবের আধিক্য ঘটে। এর ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক জলজ বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়।
